বাংলায় লিখি

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৭

শরণার্থী

সকালে উঠে মনে পড়ল কাল রাতেও আমি নিজের শরণার্থী জীবনকে স্বপ্নের আঙ্গিকে দেখে নিয়েছি। পাসপোর্ট হারানো, মাটি হারানো উদ্বাস্তু।

৬ বছরে আফ্রিকায় গিয়েছিলাম। ১০ বছরে অফিশিয়ালি শরণার্থী হিসেবে কেনিয়াতে। উগান্ডায় সামরিক অভ্যুত্থান হচ্ছিল। ভাই পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় মায়ের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিল। তার পর একের পর এক দেশে প্রত্যাবর্তন আর দেশ থেকে বিতাড়িত হবার পালা। এক বার নয়।

'সরস্বতী তোমার গলায় বা কলমে আসবেন,' এই ভরসা দিলে হেসে বলতে ইচ্ছে করে, ঠাকুরদার এক শ বছরের সংগীতের রেওয়াজ, তাঁদের সেতার, এস্রাজ, পাখোয়াজ, তবলা, তানপুরা, বাঁশি, তবলা, হারমোনিয়াম, বীণা ---যখন একের পর এক পাকিস্তানী দোসর আর সাম্প্রদায়িক গুণ্ডা-দের হাতে ভেঙ্গেচুরে সামনে লুটিয়ে পড়ছিল, আরও ছয় বছর বেঁচে থেকেও তিনি সরস্বতী-কে দোষী করেননি, --- আর আমার বাবা-পিসিরা সেই দেখে আরও তেজ নিয়ে প্রজ্বলিত হলেন। আমি কোন ছার।

স্বয়ং মাতা নাকি সরস্বতীর আশীর্বাদের মত বাবার (আমাদের) জীবনে অবতীর্ণ হয়ে হাড় ভেঙে গান আর লেখাপড়াকে উপরে বসালেন। মার বাবা দাদু ছিলেন সমাজকর্মী বিবাগী সংসারী। এমন ইস্কুল নেই তাঁর শহরে যেখানে তিনি নিজের জীবনের শেষ কড়ি দান করেননি। তেমনি মামারাও। একদা এক শিল্পী এসে চোখে জল নিয়ে আমাকে জানাল, তোমাকে দেখতে এলাম। যশোরে তোমার মামাদের দেখেছি। নিজের ভাগ্নি পরিচয়ে মাথায় তুলে তারা আমাকে তাদের সাংস্কৃতিক মঞ্চে গান করতে ডেকেছে। মেয়েটি মুসলিম পরিবারের, সেকথা না বললেও আমার বিস্ময় হত না।

দাদু আর মামা সত্যব্রত উদ্বাস্তু হবেন না পণ করে পাকিস্তানী ঘাতক আর দেশে তাদের দোসরদের হাতে নিহত হলেন। যাদের উত্তরসূরিদের জন্য ইস্কুল গড়ে দিয়েছিলেন, সেরকম কারুর হাতে।

শরণার্থী হবার আঙ্গিকে আমাদের মত হিন্দুয়ানী কথা শুনে যাদের খারাপ লাগছে, তাঁরা জানবেন, সেই সব উদ্বাস্তু হবার দুঃস্বপ্ন যখন বাস্তবকে ছাড়ে না, কারণ তারা বাস্তবের চেয়েও বাস্তব, তখন সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি না, ধরণী দ্বিধা হও।

কিছু করার না পেয়ে লিখি, গান করি, কবিতা লিখি, আর অনুবাদ করি। শিশুর সঙ্গে বই পড়ি।

এমনই অথর্ব আমাদের প্রতিরোধ -- সেই বাস্তুহারা সরস্বতীকেই ডাকি যোদ্ধা হিসেবে।

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]



এই পোস্টে লিঙ্ক:

একটি লিঙ্ক তৈরি করুন

<< হোম