বাংলায় লিখি

বৃহস্পতিবার, মার্চ ০৯, ২০১৭

দুর্বলতার সামনে না দাঁড়ালে

মেয়েদের কথা এলে ব্যাপারগুলি ব্যক্তিগত থালায় ব্যক্তিগত রেসিপিতে (আসলে উত্তরাধিকার ও পরিবেশগত রেসিপিতে) সাজাতে হয়। আমি কোন প্রবন্ধকার হতে চাইনি। হবার যোগ্যতাও নেই। তাই নৈর্ব্যক্তিক সত্যে অধিষ্ঠান করতে পারি না। আমার সত্যগুলি সব ব্যক্তিগত, আত্মিক।

ছাত্রজীবনের পুরোটা আমার নানা সংগ্রামের। ছয় বছর থেকে চব্বিশ বছরে, চারবার দেশ পাল্টাতে হয়েছে। তিন মহাদেশ। চার সংস্কৃতি। চার ভিন্ন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে হয়েছে, বন্ধুত্ব খুঁজতে ও বিশ্বাসী মানুষ চিনতে হয়েছে, পি এচ ডি করতে করতে আবার তিনবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। স্বজন ছাড়ার বেদনা বারবার মোকাবেলা করতে হয়েছে।

কোন অভিজ্ঞতা ফেলে দেবার নয়। কোন বেদনা ভুলে যাবার নয়। আর পথে একজন দুজন দুর্লভ বন্ধু পেয়ে যাওয়া বড়ো আশ্চর্য আনন্দের।

এত দিন এত পুড়ে এত সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে যে সেসব ভাবতে গেলে অবাক লাগে, তবে অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে বেশি আলোচনা করিনে।

ইংলিশ বই বাংলায় অনুবাদ করছি শৈশব থেকে। প্রথম অনুবাদ ছিল ইন্দিরা নেহেরুকে লেখা তাঁর বাবার চিঠি - ক্লাস ৭ এ অনুবাদ করেছিলাম। তারপর কবিতা পড়ে শখ হল কবিতা লেখার, পারি না পারি লিখেই চললাম শয়ে শয়ে। সমালোচনা উৎসাহ ইত্যাদি কিছুই পাইনি যা দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। অনুবাদের বেলাতেও তাই। গানের ক্ষেত্রে বাবাকে কাছে পেয়েও গিয়ে বসা হয়নি। দূর থেকে শিখেছি, পরিবেশ থাকে স্পঞ্জের মত নিয়ে। এই সব কাজ আমার ভালো লাগত। ভালো লাগত শিশুদের নিয়ে নাটক গান করতে করাতে। কিছু সুযোগ এসেছে, অনেকটা আমার আয়ত্তের বাইরে বলে অনেক খানি সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে আইডিয়ার অভাব কোনদিন বোধ করিনি। বোধ করেছি সমন্বয় আর পরিবেশগত উৎসাহের, সাপোর্টের অভাব। হাতে হাত রাখার সমষ্টিগত মানুষের অভাব। আমার ব্যর্থতা বোধ কাজ করে যায় এতে।

গবেষণার পথটাও যখন থেকে শুরু তারপর দেখছি একটা হারডল রেস। হারডল ছড়ান আছে অজস্র। আমাদের নিজেদের বাছাই এর মধ্যে থাকে সেসব হারডল, না চাইতে আসে। সমাজের দিক থেকে সামগ্রিকভাবে পাওয়া যায় না সাপোর্ট।

ছাত্রজীবন শেষ হবার পর সংগ্রাম অনেক তীব্র হয়, টিকে থাকার, বেঁচে থাকার, নিজেকে গভীর ভাবে খনন করে টেনে তোলার, খুঁজে পাবার।

উপরে উল্লিখিত এতগুলি ভালোবাসা ও আত্মিক সম্পর্কের জায়গা টিকিয়ে রাখতে সময় লাগে, অবসর লাগে, শূন্যতা লাগে, অর্থাৎ কিনা স্পেইস। বাই ডিফল্ট একজন সাংসারিক মহিলা সে স্পেইস পাবেন না। আমার আপাতত ডাক্তার দেখানর মত সময় হাতে নেই। আমি উঠে পড়ে লাগি যেন ডাক্তারের কাছে যেতে না হয়। অত লাক্সারি আমার কাছে নেই যে।

দেখেশুনে মনে হয়, আমরা কোনভাবে জীবিকা অর্জন করে সন্তান পালন ও সংসার লালন করতে পারলেই হল। বাকিটা সকলে ভেবে নেয় - এটা ওর প্রিভিলেজ, বা ভাগ্য।

ভাগ্যরেখা মুছে গেছে তৃতীয় বিশ্বের নারী হবার সুবাদে। এক পয়সাও ভাগ্যের ফেরে জোটে না যে।
ফাল্গুনী নাটকে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, সব আলো হারিয়ে গেলে অন্ধ বাউল নিজের আলোয় পথ চলে। অন্যেরা সে আলো দেখতে পায় না, কিন্তু বিশ্বাস করে। শঙ্খ ঘোষ 'অন্ধের স্পর্শের মত' বোধ আর ইন্দ্রিয়র কথা বলেছেন, মোক্ষম, সত্য, সরল, অন্তরলীন। সে পথটা হোঁচট খাবার শুধু নয়, শ্রমশীল ও উদ্গ্রীব ভাবে খুঁজে বের করার। আমাদের প্রাণী-প্রবণতা (animal instinct) তখন বেরিয়ে আসে-- একটি কাঠবেড়ালি যেমন, একটি চিতা বাঘ যেমন তার প্রত্যেকটি রোমকূপ দিয়ে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যায়।

মুখের কথা, মৌখিক পল্লবগ্রাহী পরিচয়ে আমাদের বিশ্বাস হারিয়ে গেছে কবে, বাস্তবকে চিনতে হয় শুধুই পরীক্ষামূলক ভাবে, সাবধানে, নিজের ওপর আস্থা রেখে। যখন সকলে বারণ করছে, তখন আরও আরও বেশি। নিজের gut instinct বলে একটা কথা আছে। একে ফেলনা মনে করলেই মার।

অহং-কে চিনেছি এই পথে, আমাদের সকলের সব চেয়ে বড় অন্তরায়। ঘরের শত্রু বিভীষণ, সেই মারছে আমাদের, ভিতর থেকে। সেই বিচ্ছেদ আনছে, মৃত্যুর চেয়ে স্থায়ী। তাঁকে এখানে ওখানে উঁকি মারতে দেখলে যখন চিনি, তখন বুঝি, হয়ত, হয়ত এ পথটা এখন সত্য।

এই সব মানুষের, নারীর সত্তার সংগ্রামের সঙ্গে নিরন্তর জড়ান কথা। কথাগুলি আচমকা আমার ব্যক্তিগত থাকে না, কারণ আমি দেখতে পাই কেউ না কেউ কখনো না কখনো এই পথে তাদের বাতি নিয়ে এগিয়ে আসেন। সেটা বেশ আনন্দের। 'বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার' এর মতো।

সোউল সিস্টারহুড-এর ওপর আমার আস্থা আছে, কিন্তু বোনদের ভিতরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধ না থাকলে সেটা সম্ভব নয়। শুধু নারী বলে একজন নারীর বোন হওয়া যায় না, নারী হবার সংগ্রামের, বিশেষ করে অন্তরের সব চেয়ে কঠিন সংগ্রামের পথ না হাঁটলে, হাতে হাত রাখা যায় না, এক প্লাটফর্মে আসা যায় না।

নিজের অহং, নিজের তাবৎ দুর্বলতার সামনে না দাঁড়ালে, শক্তি থাকে না।

রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, বড় বড় কথার আড়ালে কী ভাবে মিডিওক্রিটি ঢুকে যায়। কী ভাবে মহৎ মানুষের আত্মত্যাগ ধ্বংস করে পিছ দরজার কমরেডরা। 'চার অধ্যায়' পড়েই জানা যায়।

নারীবাদের পিছনে সব নারী সেই মহত্বের বা নিরহং ভালোবাসার শক্ত ভূমিতে এসেছি তো, অন্তত চেষ্টা করছি তো, নিজেদের অজ্ঞতা আর গোঁড়ামি-কে চিনে নেবার?

আমাদের দেখা এক মহীয়সী নারী বলতেন, "নিজের স্বার্থ বাদ দিয়ে দিতে পারলে, কোন কাজ সফল হবেই।" উনি স্বার্থ বলতে লোভ, আক্রোশ, এইগুলি বুঝিয়েছেন।

লোভ আর আক্রোশ নিয়ে বড় কাজ করা যায় না। আমাদের দুঃখের কথা, বেদনার কথা, সমস্যার কথা বলতে এসে এই বিষয়-টি বারবার মনে পড়ে যায়।

৭ মার্চ ২০১৭

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]



এই পোস্টে লিঙ্ক:

একটি লিঙ্ক তৈরি করুন

<< হোম