বাংলায় লিখি

রবিবার, মার্চ ০৫, ২০১৭

মেয়েদের ক্ষমতায়নের পথটা কঠিন

আমাদের মা-র অলৌকিক ক্ষমতা আমরা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেছিলাম। সংসারের পরিচালক, কর্মী, সংগঠক, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণযোগাযোগ কর্মী ও নেতা এবং আরও একশটা পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকায় তিনি, কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা তাঁর কাছে এত প্রত্যাশিত আর থ্যাঙ্কলেস, অর্থাৎ ধন্যবাদ দিয়ে ছোট হয়ে যাবার ভয়ে সংসারে কেউ আর এ কথা বলেনি, তাই বহুদিন বুঝতে পারিনি, যে মার (বা মা-দের) ভূমিকা কেমন হয়, আর কীসের জন্য আমাদের জীবন এতটা মসৃণ, লাবণ্যময়, সুস্থ, সুন্দর।

স্বভাবত এই কারণে, ছোটবেলায় বাবাই ছিলেন রোল মডেল।

দুই রোল মডেলের মধ্যে বাবা-কে বাইরে থেকে বাহবা দেবার কেউ না থাক, পিসিরা ছিলেন। তাই জানতে পেরেছিলাম বাবার প্রতিভা, তাঁর সঙ্গে মহত্ব, শক্তি, পান্ডিত্য, বিনয়, সরলতা, সাহস আর মমতার কথা - না বললেও বুঝতে পারতাম হয়ত। প্রজ্ঞার ব্যাপারটা বুঝেছি নিজেরাই, আরও পরে।

তো, সেই বাবা বলতেন ছোটবেলায় একটি কথা, যে কথা আজ তাঁর মনে আছে কিনা জানি না। আমার ভাই তখনও জন্ম নেয়নি। আমার বয়েস ৬-৭-৮। বলতেন, 'তুমিই আমার ছেলে, তুমিই আমার মেয়ে।' কপালে আদর করে দিয়ে।

তাতেই সমস্যাটা হল

আমরা শিভালরি অথবা পুরুষের সাহায্যের জন্য কোনদিন অপেক্ষা করিনি। নিজেই শিভালরি চর্চা করেছি। বাজারের ভারি ব্যাগ টানা, সংসারের দায়িত্ব বোঝার চেষ্টা করা, সামাজিক দায়িত্ব, সহনশীলতা, চুপ করে সহ্য করার চর্চাটাও সেখান থেকে। সাহায্য চাইবার ব্যাপারে এখনও আমার অসুবিধে হয়।

পরে বুঝেছি মেয়েরাই সদাসর্বদা শিভালরাস -- অন্তত আমাদের মা-কে তেমনটাই দেখেছি। কারুর বিপদ যেন সর্বদা তাঁর। ঝাঁপ দেবেনই। আমার মা হেট্রেড মানেন না। কেউ তাঁর বিপদ-আপদ ঘটালেও মানেন না। দুর্দিনে তাঁদের বিপদে তবু তিনি ঝাঁপ দেবেন।

শিভালরি কাকে বলে এই তো অনেকটা বাবা মা-কে দেখে চেনা। মার ক্ষেত্রে, একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পিতার উত্তরাধিকার। আমাদের দাদামশাই নাকি আয়ের চেয়ে ব্যয় করতেন বেশি, আর তা সামাজিক কাজেই। দয়ার শরীরটা সহ্য করতে পারেনি রাজাকাররা।

বাবার ক্ষেত্রেও, স্বাধীনতা বিপ্লবীদের জীবন দানের আদর্শে বেড়ে ওঠা যার শৈশব কৈশোর।

তাই, বোকার অধম আমরা, অনেক পুরুষের ঘাম ফেলার আগেই ঘামটা ফেলতে এগিয়ে এসেছি। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি একটু নরম ও ভালনারেব্ল অভিনয় করতে পারলে কতোই না সুবিধে। তাও শিখতে পারলাম না।

নিজেকে সুস্থ রাখাটা জরুরি ছিল, অন্যের স্বার্থে জীবনীশক্তি দান করতে গিয়েই তাও করতে পারলাম কই।

এ প্রসঙ্গে সাম্যবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ মানুষ আমার পিসি মুক্তি মজুমদারকে মনে না করে উপায় রইল না

মুক্তি মজুমদার মৃত্যুর আগে আমাদের কাউকে পাননি। সারা জীবন দেবার পর নানা কারণে পাননি। আমাদের দায় আমাদের স্বীকার করে যেতে হবে আমৃত্যু!

আমরা হয়ত লাভবান হলাম, অবাধ দাতার কাছ থেকে গ্রহণ করার সুবিধে হল, ধন্যবাদ দিতে হয় না, কৃতজ্ঞ হতে হয় না, গুছিয়ে নেওয়া যায় ঠিক।

মুক্তি মজুমদার যেমন দিলেন

আমাদের সীমায়িত গণ্ডীতেও আমরা এমন অভিজ্ঞতা যেমন শিখে নিলাম

সারা জীবন একজন পুরুষেরই সাহায্য নিয়েছি নম্রনত হয়ে। তিনি আমার বাবা।

নিতে না পারার এই দোষটা ভালো না। এখন মানুষ হিসেবে নিজেকে একটু সম্মান করেই, এবং বয়েসের সাথে প্রজ্ঞা বাড়ছে বলে বোধহয়, অন্যের হার্দিক দান হাতে এসে পড়লে, তা নম্র হয়ে নিতেও শিখছি।

এম্পাওয়ারমেন্টটা ঠিক মত হল কিনা জানি না, তবে এই এম্পাওয়ারমেন্টের পথেই ছিলাম সারা জীবন। বাংলাদেশে এমন ঘটনা অনেক ঘটে, আবার ঘটেও না।

সব্যসাচী পরিশ্রমের জায়গায় কখনো গলিপথ বা পিছনের পথ খুঁজতে যাইনি। অন্যের দিকটা রাখতে গিয়ে ভদ্রতার খাতিরে নিজেই বিপন্ন হয়েছি। এই জেনে যে আমরা তো পারি। আহা বেচারা, ওরা তো পারে না।

এম্পাওয়ারমেন্টের এই পথ কঠিন

ভিক্ষাজীবি হব না, আমাদেরটা আমরা বুঝব, অন্যেরটাও বুঝব, আমরা যে মানব-পরিবার -- এমন সাম্যবাদী স্বর্গ চিনিয়েছিলেন আমাদের মা বাবা, পিসি-পিসে, দাদামশাই, মামা-রা। অবশ্যই তাঁদের সীমার মধ্যে। ছোট অহঙ্কারের সীমা লঙ্ঘনের প্রসিদ্ধিও ছিল তাঁদের।

হাত-পাতা, বা কারুর মাথায় হাত বুলিয়ে কথায় চিঁড়ে ভিজিয়ে কাজ উদ্ধার বা ম্যাস্কুলিন অথবা ফেমিনিন চার্ম দিয়ে পুরুষদের (বা নারীদের) জয় করার বিষয়গুলি ছোটবেলা থেকে বুঝতে পারিনি। একটু বিরক্ত যে লাগেনি, তা বলতে পারিনে।

যে-সময় সাজগোজ করে বেড়াতে যাবার ছিল (আমাদের সময় সেলফি ছিল না, কিন্তু বসন্তের বাতাস নিশ্চয়ই ছিল), সে সময় পাত্তা দিইনি চেহারাকে, নিজের রঙিন সত্তাকে। চিন্তা ছিল বই নিয়ে, পড়াশুনো নিয়ে, মাথায় গিজগিজ করত লেখা, সেসব আলোর মুখ দেখুক না দেখুক। এ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। ফ্যাক্টস আর ফ্যাক্টস। ভালো মন্দ সব আপেক্ষিক।

মাথায় এক সময় বিজবিজ করত রবীন্দ্রনাথ -- 'সব নিতে চাই' এবং 'সব দিতে চাই' এর বীজ, রবীন্দ্রগান।
এসব মনে হতে পারে ভ্রান্ত স্বর্গ -- কিন্তু সে স্বর্গে অনেকে আঙুল দেখিয়ে টিটকারি দিলেও আমি তা মেনে নিইনি।
এই সমাজ-এর নানা কষ্টকর গ্লানিকর দৃষ্টিকোন থেকে দূরে থাকা ভ্রান্ত স্বর্গ যে অনেক দিন লালন করতে পেরেছি জীবনে, এও এক এম্পাওয়ারমেন্ট।

পরিবারের শিক্ষাদীক্ষা ছাড়া আর পরিবার, বন্ধুদের অর্জিত অনন্ত কিছু ভালোবাসা ছাড়া আর কোন পুঁজি নিয়ে ধরাধামে আসিনি। সেই পুঁজি নিয়ে যদি মরে যেতে পারি, তবেই জীবন সার্থক।

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]



এই পোস্টে লিঙ্ক:

একটি লিঙ্ক তৈরি করুন

<< হোম