বাংলায় লিখি

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১৬

আমরা তো বাঙালি

দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যবশত শিশুকাল থেকে বেদুইনের মতো দেশে দেশে ঘুরছি। দেশ বিদেশ নিয়ে আগ্রহ থাকে, কারণ আমাদের সীমিত চোখের বাঁধন খুলে পড়ে নির্মোহ তলোয়ারের টানে। সংকীর্ণতা কাটে। দেশ দেশ করে চেঁচিয়ে আমরা দেশোদ্ধার করতে পারিনি, পারবও না। নিজেদের আমূল পাল্টাতে হবে। 

গণযোগাযোগ ব্যবস্থা যে দেশে নেই বা অকেজো, সে দেশে সাধারণ মানুষ, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দিকে কোনো খেয়াল রাখা হয়নি।  যে গণযোগাযোগ ব্যবস্থায় যে দেশে নিরাপত্তা নেই, সে দেশে জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি লোক, অর্থাৎ নারী ও শিশু যে চলাচল করতে পারবে না, অচল হয়ে থাকবে তারা, অথবা গুরুতর ভাবে পরনির্ভরশীল, সেটা বেদবাক্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। এতে কারুর কোনো সমস্যা নেই।

গাড়িঅলা মানুষদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি বাংলাদেশে প্রাইভেট গাড়ি একটা অভিশাপ। নিরাপত্তা থাকলে আর দুই চাকার স্কুটার থাকলে আর কারুর কিছু দরকার হত না। 

চীনে বা পুবের 'উন্নত' দেশে সকলেই (সত্যি!) দু চাকার বহন চালায়। স্ট্যাটাস কমে না এগুলো ব্যবহার করলে। গ্যাস এমিশন হয় না, পরিবেশ বাঁচে। ট্র্যাফিক জ্যাম হয় না। একে অন্যের ঘাড়ে উঠে যেতে হয় না। দুর্ঘটনা কম ঘটে।

সেখানে পথচারী আর সাইকেলচালকদের আলাদা পথ (লেইন) থাকে। কলা আর কদবেল কে এক বলে মনে  করলে আমরা ঢালাও একই রাস্তায় চলতে থাকব আর ট্রাক-বাস-গাড়ি  আর অটো-ভ্যান-পথচারীর মধ্যে সংঘাত কমবে না। এভাবে কম মানুষকে আমরা হারাইনি।

গাড়ি, পথচারী, কুকুর, ট্রাক আর মানুষ -- সকলেই একই রাস্তাই চলাচল করে - এমনটা এশিয়াতে আমাদের দু' তিনটে দেশেই ঘটে! তাই সবাই সবার ওপর খাপ্পা। রিক্সা-আরোহী বোঝে না কেন ট্রাকের মত বেঢপ বস্তুকে তার গায়ের ওপর দিয়ে চলতে দিতে হবে। গাড়িচালকরা প্রায় অভিযোগ তোলেন যে রিক্সাঅলা নিজেকে রাজাবাদশা মনে করে। আসলে গাড়িঅলা (যাঁর প্রায়শ চালক আছে) আর রিক্সাঅলার মধ্যে কে রাজা আর কে প্রজা সেটা তো এরকম একটা সামন্তবাদী প্রথায় বুঝতে দিতে হবে - আসল সমস্যার দিকে অথবা রাজা বা প্রজার কারুর কোনো খেয়াল নেই। ওই গাড়িআরোহী "শিক্ষিত" অশিক্ষিত লোক এমন কথা বললে আমাদের  শুধু মনে করিয়ে দিতে হয়, যে সিস্টেমের গোলমাল বিস্তর। সবার এক রাস্তায় এক লেইনে চলার কথা নয়। কোনো 'উন্নত' দেশ তা করতে দেয় না। 

এছাড়া উন্নত দেশে ছোট পরিসর শহরে গ্রামে সাইকেল চালানোর রেওয়াজ আছে  - ফুটপথে বা আলাদা লেইনে। এতে স্বনির্ভরতা আর কায়িক শ্রম হয়, টাকা দিয়ে জিমে বা হাসপাতালে সময় নষ্ট করার দরকার করে না। 

আর হ্যা, উন্নত দেশে অনেক হিচহাইকার আছেন, যারা পয়্দল চলেন আর রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে লিফট নেন -- এতে তাদের আত্মসম্মান খর্ব হয়না - পরিবেশবাদীরা তেলগ্যাস বাঁচানোর জন্য তাদের পিঠে স্নেহের চাপড়ই দেবেন। আর তাদের আত্মমর্যাদা আর আনন্দর কথা তো আর লিখে বোঝানো যাবে না। 

কারণ, 'হাঁটবে কেন, রিক্সা নাও' অথবা 'সিঁড়ি ভাঙবে কেন, লিফট নাও' - যখন আমাদের এইটাই মটো  এবং প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে। পরের প্রজন্মে পায়ের যে কোনো দরকার ছিল, সেটা আর বুঝতে দিতে হবে না। গতরে মেদ বাড়ছে আর অসুখ হচ্ছে, কিন্তু তার জন্য হাঁটার দরকার কি? আমরা তো বাঙালি। 

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]



এই পোস্টে লিঙ্ক:

একটি লিঙ্ক তৈরি করুন

<< হোম