বাংলায় লিখি

বৃহস্পতিবার, মে ০৩, ২০১২

রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদ প্রসঙ্গে



রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদ নিয়ে একটি ইংলিশ লেখার তর্জমা এটি, আমার শ্রদ্ধাভাজন কাকু সুশীল সাহার কথায় করছি | আগেই বলে নিই, গানের অনুবাদ আমার বিষয় নয়, আমি রাশিবিজ্ঞানের ছাত্রী | তবু প্রায় দশ বছর ধরে রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদের সঙ্গে কীভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছি | সুশীল কাকার অনুরোধে আমি একটু ভয় ও কুন্ঠার সঙ্গেই এই লেখাটি সকলের সামনে তুলে ধরছি | লেখাটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরে কিছুই নয় | 

রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদ দুরূহ কাজ, এতে নিরন্তর লেগে থেকেও লক্ষ্যস্থলে তীর ছুঁড়তে না পারার বেদনা, হতাশা থেকেই যায় | প্রথমত, বাঙালী শিক্ষিত জন জানেন রবীন্দ্রনাথের সুর ও বাণীর মিশেলের মধ্যে যে অমর্ত্য, অজর অনুভূতি আছে, স্বাভাবিকতা আছে, তাকে নিছক বাণীর অনুবাদের মধ্যে ধরা যায় না, অনেক ক্ষেত্রেই ছন্দের, অন্ত্যঃমিলের, অনুপ্রাসের ব্যঞ্জনা, যা কাব্যকে চমক ও সৌন্দর্য্য দেয়, তা অনুবাদে অনুপস্থিত| সুতরাং বাঙালী রবীন্দ্র-ভক্তের কাছে, প্রায়শ, রবীন্দ্রসংগীত অনুবাদ এক ধরনের দুর্বল, ব্যর্থ, ছেলেমানুষী চেষ্টা বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক |  

এতদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রসংগীতের যে অনুবাদ হয়েছে, তা দুইটি ভিন্ন উদ্দেশ্য মেটাতে গিয়েই হয়েছে | প্রথমত, রবীন্দ্রনাথের, বা ইয়েটস-এর হাত দিয়ে শুরু হওয়া, রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদ; ইংলিশ গদ্য-কাব্যের আদলে | রবীন্দ্রনাথ অনূদিত গানের ফলশ্রুতি রবীন্দ্রনাথের নোবেল-বিজয়ী গ্রন্থ, গীতাঞ্জলি | সুর, দোলা, ভাব, কাব্যসম্ভার সবটুকু মনে রেখেই এই অনুবাদ, এতে বাংলায় অনভ্যস্ত ইংরিজি পাঠক পান কবিতার প্রাণকে, অন্তত সেটাই লক্ষ্য | গানের গতি, গানের ছবিকে বিম্বিত করবে অনুবাদ, স্বচ্ছ, শান্ত হ্রদের মত | ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মত মননশীল লেখিকা এই ধরনের অনুবাদ পড়েই রবীন্দ্র-অনুরাগী হয়েছিলেন | পরবর্তীতে এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন অনেক লেখক; সকলের কথা না জানলেও, জানা আছে লুডুইগ উইটগেনস্টাইন, ক্ষীতিশ রায়, উইলিয়াম রাদিচে, অমিয় চক্রবর্তী, কেতকী কুশারী ডাইসন-এর কথা | অন্য দিকে, রবীন্দ্রসংগীত-কে গাওয়ার জন্য গানে রূপান্তরিত করা, সেটি আরেক উদ্দেশ্য | এই উদ্দেশ্য সফলভাবে হাসিল করা, আমার মতে আরো অনেক কঠিন | শুধু ভাব নয়, গানের ছন্দ, দোলাকে হুবহু অক্ষত রেখে অনুবাদ করতে হবে, এবং খেয়াল রাখতে হবে, পড়তে যেন নিছক শিশুতোষ ছড়ার মত না শোনায় | আর্নল্ড বাকে বলে এক ব্যক্তি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই কাজটি করেছেন, এবং এর রেকর্ড-ও রেখে গেছেন, যদিও অধুনা তাঁর কথা আমরা কম শুনেছি
 
আমার ব্যক্তিগত ধারণা, সুর, ছন্দ, ভাষার অন্যান্য অলংকার ও সৌন্দর্য্য বজায় না রেখেও, সুরের স্মৃতিকে সম্বল করে শুধুমাত্র গানের নির্যাসকে তর্জমায় রূপান্তর খুবই দুরূহ | অথচ কোনো একসময় অনুবাদ তার নিজের পায়ে দাঁড়ায়, অনুকরণ মানেনা, তর্জমার কাজ তখন সৃষ্টির খুব কাছাকাছি, তাই তাকে অনুবাদ না বলে অনুসৃজন, বা transcreation বলা যায় | তর্জমা তখন শিল্পকর্মের মত স্বকীয়, এবং তখন একই গানের একাধিক অনুবাদ সমান্তরাল ভাবেই সার্থক হতে পারে, এদের প্রতিতুলনা অর্থহীন হতে পারে |

প্রথম যখন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনোর জন্য এলাম, তখন এক নতুন সমস্যা দেখা দেয় | রবীন্দ্রনাথের গান আমার বাংলা-না-জানা বন্ধুদের সঙ্গে এক সঙ্গে গাইতে পারার উদ্দেশে প্রথমে অনুবাদ করে তা ওদের বোঝানোর দরকার ছিল | এই গানগুলি অনুবাদের পর অনেক মার্কিন ছেলেমেয়ের মনে স্থান পায়, সেটি লক্ষ্য করে প্রাণিত বোধ করি | পরে, যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা এক ভারতীয় নৃত্য একাডেমী আমাকে তাঁদের অনুষ্ঠানের জন্যে রবীন্দ্রনাথের শাপমোচন ও চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের অনুবাদ করতে অনুরোধ করেন | আরও পরে, প্রতি সপ্তাহে লম্বা দূরত্ব পাড়ির সময়, পথের অবসাদ ভুলে থাকার জন্য, আমি আবার রবীন্দ্রনাথের অনুবাদে ফিরে আসি |

অনুবাদগুলি একত্র করে, সংরক্ষণ করার প্রয়াস আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধু রুমেলা সেনগুপ্তর | একসময় সে-ই আমার ও তাঁর নিজের অনুবাদের একটি নিজস্ব পরিপাটি জায়গা তৈরী করে দেয় | আমরা Gitabitan in English (http://gitabitan-en.blogspot.com) নামের একটি ব্লগে আমাদের অনুবাদকে ধারাবাহিক ভাবে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হই | রুমেলার অসংখ্য প্রতিভার মধ্যে একটি তাঁর শিল্পী সত্ত্বা, যেটি এই ব্লগ নির্মাণের সময় তার সাক্ষর রাখে এর অসামান্য সৌন্দর্য্যে | এই ব্লগ আমাদের খেলার আকাশ, কাজের নিভৃত আশ্রয় হয়ে ওঠে | ২০০৯ নির্মিত এই ব্লগে এখনো পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাতশটি গানের অনুবাদ হয়েছে | রবীন্দ্রনাথ নিজে ২২০০ এর বেশি গান রচনা করেছিলেন, কাজেই পুরো গানের ভাঁড়ার ছোঁয়ার এখনো অনেক বাকি | এই অনুবাদের মাধ্যমে আমরা নিজেদের সৃজনশীল শেকড়ে, অন্তরের আশ্রয়ে ফিরে আসি, রবীন্দ্রনাথের অনুরাগীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরী হয়, এবং বাংলা-না-জানা বিশ্বে, ওঁর গান যাঁদের ছুঁতে পারে, তাদের কাছে হাত বাড়িয়ে দিতে পারি, কিছুটা হলেও |
 
এই ব্লগের তর্জমাগুলি সাধারণত আমাদের নিজেদের প্রাত্যহিক অনুভব, অভিজ্ঞতা, পথ চলা দিয়ে অনুরণিত হয় | আমাদের রোজকার অনুবাদের বাছাই সেভাবেই কাজ করে | তবে তার সঙ্গেসঙ্গে সমাজের ও সময়ের সঙ্গেও স্পন্দিত হয়ে থাকে | কেউ কেউ কখনো কোনো বিশেষ অনুবাদের প্রয়োজনে ফরমায়েশ জানালে আমরা খুবই খুশী হয়ে সেই প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করেছি|

আমরা লক্ষ্য করি, এই ব্লগের মতামত পেশ করার ছোট পরিসরে অনেক মানুষ তাঁদের মতামত ব্যক্ত করতে চেয়েছেন.. কাজেই বৃহত্তর আড্ডা-ঘর হিসেবে ফেইসবুকে একটি গ্রুপ খোলে রুমেলা, নাম দেয়, Thoughts of Tagore | এই গ্রুপেই আমরা নতুন কোনো অনুবাদ পোস্ট করে দিই | অনেকে এগিয়ে এসেছেন সহমর্মিতা ও সময় নিয়ে, এক ধরনের রবীন্দ্র-গানের চর্চায়, গঠনমূলক সমালোচনায় | উদ্দেশ্য, গানের অন্তর্নিহিত শক্তি, প্রাণ, ভাব, ছবি যেন ঠিক মত বেরিয়ে আসে...পাঠক হিসেবে তাঁরা তাদের যে মূল্যবান সমালোচনা দিয়েছেন, তার জন্যই আজকে গানের অনুবাদ কিছুটা হলেও মোক্ষম হতে পেরেছে | এঁরা হলেন আমাদের সহ-স্রষ্টা: সুমন দাসগুপ্ত, সৌম্য শংকর বসু, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় এবং আরো অনেকে

 আমাদের এই ব্লগের সঙ্গেই সৃষ্টি হয় আরেকটি ব্লগ, যেখানে গান ছাড়া রবীন্দ্রনাথের বাকী কবিতার অনুবাদগুলি সংরক্ষিত হয়:  Tagore Poems in English (http://tagore-poems-en.blogspot.com/)... এতে সুব্রত মজুমদার, রুমেলা ইত্যাদি অনুবাদকরা আছেন, তবে মূলত এর তর্জমার স্রষ্টা, আমাদের আরেকজন শিল্পী বন্ধু, দেবযানী চক্রবর্তী | দেবযানীর সঙ্গে পরিচয় হঠাত-দেখার মতই আকস্মিক, এবং তার অপার, অসাধারণ সৌন্দর্য্য ও প্রতিভার নাগাল পাওয়ার যে বিন্দুমাত্র একটি অবকাশ এই ব্লগের অনুবাদের মাধ্যমে আমি পাই, এতে খুবই খুশি ও কৃতার্থ বোধ করি | তাঁর কবিতার অনুবাদে অন্য এক সুবাতাসের পরিচয় পেয়েছি, যা আমার ভাষাগত বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষাকে অনেকটা সাহায্য করেছে |

রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতে সময়ের ভাঁজ পড়েনি, এই অজরতা, সার্বজনীনতার একটা সুবিধে আছে ঠিকই, অর্থাত্ এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবতে হয় না, কিন্তু তর্জমার মূল প্রতিবন্ধকতা এর ভাষা, শৈলীকে সমসাময়িক, বিশ্বগ্রাহী করে গড়ে তোলা, যেন তা মহাদেশ ও সাংস্কৃতিক সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে | এই শেষের কাজ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হয় অনেকটাই | 

সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন প্রবীণ মার্কিন ভদ্রলোকের দেখা পাই, যিনি বহুদিন সে দেশে বসবাস করেছেন, এবং স্বচ্ছন্দে বাংলা বলতে পারেন | শুধু তাই নয়, ১৫ বছর ধরে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদ করে চলেছেন, এবং বাংলা ও ইংরিজি দুই ভাষাতেই গানগুলি গেয়ে চলেছেন | তাঁর নাম জন থর্প | অনুবাদগুলি তাঁর নিজের | তাঁর বলিষ্ঠ, সুললিত গায়কী এবং মোক্ষম তর্জমার জন্যই হয়ত, গানগুলি শুনতে একটুও বেকায়দা শোনাচ্ছে না | ইতিপূর্বে আমার শ্রদ্ধাভাজন অনেক মানুষ, সুশীলকাকু তাঁদের অন্যতম, এই বিষয়ে আমাকে উত্সাহ দিয়েছেন | কাজেই জনের অনুবাদ ও গান শুনে আমি নতুন উদ্যমে গানের ছন্দ বজায় রেখে অন্ত্যঃমিল বজায় রেখে(গান করার জন্য) ইংরিজি অনুবাদ শুরু করি | এটি যেমন প্রেরণাদায়ক তেমনি সময়সাধ্য বিষয়, সেটা বুঝতে দেরী হয় না | এতে অনেক খানিকটা পরীক্ষানীরিক্ষার ব্যাপার আছে--এখনো এই ব্যাপারে আমার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, এর বাধা ও আলো পথকে উস্কে দিচ্ছে| 

আমার নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রথম থেকেই আমি উত্কন্ঠায় আছি-- আমি ইংরিজি সাহিত্যিক নই, এমনকি সাহিত্যের ছাত্রও নই | সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা আমাকে বিড়ম্বিত করে | সুতরাং বহুসময় অনেক পরিশ্রমী, আন্তরিক পাঠকের কাছে যখন খুঁটিনাটি দিকনির্দেশ বা সৃজনশীল সমালোচনা পেয়েছি, তখন তা সমাদরের সঙ্গে গ্রহণ করেছি| সাহিত্যের সঙ্গে একটি আত্মীয়তা, একটি জোরালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করি, সমসাময়িক ইংরিজি সাহিত্যের বলিষ্ঠ লেখক, দার্শনিক, কবিদের লেখা পড়ার চেষ্টা করি | কিছু অসাধারণ লেখকের কাজ আমাকে গভীরভাবে প্রাণিত করে চলেছে |
আমার মতে, অনুসৃজনের সময়, সৃষ্টির আবেগ, দীপ্তি, জীবন, জগত সম্পর্কে একটি দুর্দান্ত প্রেরণার ঢেউয়ে ভেসে না গেলে ঠিকমত তর্জমা করা যায় না | এই প্রেরণাই নিজেদের প্রাত্যহিকতার ধুলো ও মলিনতা দূর করে, গভীর ক্ষত নিরাময় করে | এই প্রেরণা না থাকলে সৃষ্টি বৈভবহীন, শুকনো | এই শুষ্কতার অভিজ্ঞতা আমার অনেকবার হয়েছে | তবু মাঝেমধ্যে একভাবে বসে তর্জমা করতে হয় – প্রথম খসড়া অনেক সময় মনের মত হয় না | তবু তা পরবর্তী খসড়ার জন্য সিঁড়ি বা কঙ্কাল হিসেবে কাজে আসে | ক্রমশ হাতুড়ি পেটানোর মত অনেক ঢালাই-পেটাই করতে হয় – অপ্রয়োজনীয়, অপরিশ্রুত অংশ ছেঁটে ফেলতে হয়, যতক্ষণ না ঠিক যতটুকু দরকার বলে মনে হয়, ততটুকুই বাকি থেকে যায়| ভাষা নিজেই এমন তরল এবং সর্বগ্রাসী | সঠিক জিনিসটিকে টেনে নেবার চুম্বকীয় আকর্ষণ, গলিয়ে নেবার দ্রাব্যতা আছে ভাষার | ভাষার আকর্ষণ অনুসৃজনের একটি দিক | রবীন্দ্রসংগীত শুধুমাত্র আত্মিক নয়, ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য অনুভূতির জিনিসও বটে | এই অসাধারণ প্রকাশভঙ্গী ও অন্তর্লীন গভীরতাকে ধারণ করার ক্ষমতা তৈরী করার একটা দুর্দান্ত আবেগ অনুসৃজকের দায়িত্ব, এবং এই দায়িত্ব আসলে তার স্বাধীনতাই | তার কাজ গানটির সুর ও শব্দকে, এর ভাষা ও প্রকাশভঙ্গীকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ ও নিজস্ব করে তোলা | তর্জমা যেন অন্য ভাষায় গানটিকে মজুদ করার দীন চেষ্টায় পর্যবসিত না হয়, যেন অনুসৃজকের হৃদ-যন্ত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে এর জন্ম-প্রক্রিয়া| 

ইংরিজি ভাষার প্রবচন, বাগধারা, ভাষার সূক্ষ্মতা, শাব্দিকতা, ধ্বনি, অনুপ্রাস, এগুলি সবই সময়-অসময় মনে টুকে রেখে পরে ব্যবহার করার চেষ্টা করি | এতে প্রয়োজনের সময় ঝোলায় কিছু দরকারী সামগ্রী মজুদ পাওয়া যায় | মনে আছে শব্দের মোক্ষম ব্যবহার নিয়ে অনেক আগে কথা-সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, শব্দকে তীরের মত মোক্ষম ভাবে ধরতে হয়, অর্থভেদী বান দিয়ে, অনুবাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য|  

লেখার প্রথম ড্রাফটের পরে অসংখ্য বার কলম চালাতে হতে পারে, এবং আমার ক্ষেত্রে সাধারণত হয়, যতক্ষণ মনে হয় এর বেশি আমার কিছু করার ছিল না, তবু এক মাস পরে ফিরে এলে কোনো কোনো সময় অন্য ভাবে কলম ধরতেও ইচ্ছে করে | 

এছাড়া রবীন্দ্রনাথের প্রতি আগ্রহ আশৈশব, পারিবারিক ভাবে সেটি পাওয়া| আমার ঠাকুরদা সুবোধচন্দ্র মজুমদার, খুলনায় রাবীন্দ্রিক ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়া তৈরীর অগ্রগণ্য এবং অবিভক্ত ভারতবর্ষে রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে পুরোধা ছিলেন | মাত্র ত্রিশ বছর বয়েসে তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের মূল স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সঙ্গে স্বরলিপি প্রসঙ্গে মৌলিক আলোচনা করেছেন, কলকাতার সঙ্গীত একাডেমিতে ওস্তাদ এনায়েত খান-এর কাছে সেতারে তালিম নিয়েছেন, নিজের বাড়িতে এস্রাজ, খোল, পাখোয়াজ, তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশী, সেতার, বেহালা নিজের সাত সন্তানকে ও স্থানীয় শিল্পীদের শিখিয়েছেন, এছাড়া গানে সুর দেওয়া, রবীন্দ্রনাথের গান নিজে স্বাধীন ভাবে রপ্ত করে, তা সমাজ ও দেশের স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া, রবীন্দ্রনাটক ও নৃত্যনাট্য পরিচালনা করা, নানা রকম রাগ-রাগিনীর তালিম দেওয়া তো ছিলই | প্রখ্যাত শিল্পীরা অল্প বয়েসে সেই সময় তাঁর কাছে সঙ্গীতচর্চার জন্য এসেছেন
 
আমার পিসি ঊমা মজুমদার-এর গানের কন্ঠ ও দক্ষতা প্রবাদপ্রতিম, প্রথমত পিতা সুবোধচন্দ্র মজুমদার তাঁর সঙ্গীত শিক্ষক এবং তারপর, কলকাতার রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষ শিক্ষায়তন গীতবিতান-এ পড়াশুনো করেন তিনি | এখানে তাঁর গুরুমশাই ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের ওস্তাদ, অনাদি দস্তিদার, কনক দাস (বিশ্বাস), নীহার বিন্দু সেন, রমেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ | পিসি মুক্তি মজুমদার অসাধারণ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, বহু প্রতিভার অধিকারী, এবং রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদের প্রধান থেকে শুরু করে খুলনার সাংস্কৃতিক জগতে পুরোধা ছিলেন, এখনো আছেন, রবীন্দ্রসংগীত চর্চার জগতে তাঁর অবদান সংশ্লিষ্ট সকলে জানেন | আমার মা দীপিকা মজুমদার রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রতে, অনেক বছর ধরে নিয়োজিত | আমার বাবা সুব্রত মজুমদার বাংলাদেশের বহু প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গীতশিক্ষক, গানের ব্যাপারে তার পান্ডিত্য অগাধ, বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীতের চর্চার শুরু তাঁর হাত দিয়ে | তাঁর প্রতিভা নানামুখী | বয়স যখন বিশের কোঠায় সেসময় তিনি রবীন্দ্রসংগীতের যে অনুবাদ করতেন, সেগুলি তাঁদের পারিবারিক সাময়িকীতে বের হবার সুবাদে আমার হাতে আসে | বোধের গভীরতা আর ভাষার দখল দেখে কতটা প্রাণিত হয়েছিলাম মনে আছে | কাজেই অনেক কিছুর মত, রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের বিষয়টিও আমার পরিবার থেকে পাওয়া
 
আমার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদের অভিজ্ঞতা এই; এ পথে যে চড়াই-উতরাই, হতাশা, উদ্যম, প্রেরণা বা শিক্ষা পেয়েছি, তাই ওপরে লিখলাম |

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]



এই পোস্টে লিঙ্ক:

একটি লিঙ্ক তৈরি করুন

<< হোম