বাংলায় লিখি

সোমবার, জুন ০৪, ২০১৮

ব্রেনে ব্রাউন ৫ম অধ্যায়ঃ বানোয়াটকে সত্য দিয়ে প্রতিহত করুন। পরিশীলিত থাকুন।

"যে মিথ্যা বলে আর যে সত্যভাষণ করে তারা যেন একই খেলার দুই বিপরীত দলে খেলছে। উভয়পক্ষ ঘটনাকে যেমন ভাবে দেখছে তেমন ভাবেই তুলে ধরে, যদিও একজনের প্রতিক্রিয়া সত্যের শাসন মেনে, আর অন্য জন সেই শাসন মানতে ইচ্ছুক না -- তাই বিরোধিতা ক'রে। কিন্তু যে আজগুবি বানোয়াট কথা বলে সে সত্যের শাসন মেনে নেয় না, এর বিরোধিতাও করে না। সে একে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, যেন তা অদৃশ্য। সেই জন্য সত্যের সবচেয়ে বড়ো শত্রু মিথ্যা নয়, বানোয়াট।"

-হ্যারি জে ফ্র্যাঙ্কফুট

কার্ল ইয়ুং যে আপাতবিরোধিতাকে এক পরম আত্মিক সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছেন এতে আমি খুব আশ্বস্ত হই। নাহলে আপন হওয়ার এই অনুশীলন আমাকে সমস্যায় ফেলত। আমি বানোয়াট কথাকে সত্য দিয়ে প্রতিহত করায় বিশ্বাসী। পরিশীলিত থাকায়ও বিশ্বাসী। কিন্তু এই দুইকে মেলানো বেশ কঠিন। এই অধ্যায়ে আমরা বানোয়াট কী ভাবে তৈরি হয়, এবং কেমন চেহারা নেয়, সেসব দেখব। আর শিখব বানোয়াটের বিষ্ঠায় হাঁটু সমান ডুবেও কেমন করে পরিশীলিত থাকতে হয়।

লেবেলসমূহ: ,

ব্রেনে ব্রাউন ২য় অধ্যায়

এই সকল প্রশ্নের জবাবে যা পাওয়া গেল, তা থেকে চারটে মূল সারকথা আমি ছেঁকে তুলতে পেরেছি। এই কথাগুলি আমাদের আজকের সমাজ-বাস্তবতার কথা। এসব কোনো প্রতিপাদ্য নয়, মাথার মধ্যে তৈরি হওয়া তত্ত্ব নয় -- উপাত্ত থেকে, বাস্তব মানুষের বাস্তব সমাজ থেকে পাওয়া সারকথা। বাস্তব উপাত্ত আমাকে বুঝিয়ে দেয়, আপন হওয়া কাকে বলে আর কী ভাবে আপন হতে হয় এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আজকের দুনিয়ার মতাদর্শের তীব্র ভেদাভেদের বাস্তব ছবি এড়িয়ে, রাজনৈতিক আদর্শের ঝগড়া বিবাদ এড়িয়ে আমরা তা পারব না। অথচ দেখুন আমি এসবের মধ্যে আদৌ যেতে চাইনি। কিন্তু আমি তো আমার উপাত্তকে অস্বীকার করতে পারি না। উপাত্ত আমাকে যেখানে নিয়ে যায়, আমি সেখানেই যেতে বাধ্য।

আমার গবেষণায় খুঁজে পাওয়া চারখানা সারকথা নিচে দিলাম। একটু দেখলে বোঝা যাবে সব কটাই আসলে প্রাত্যহিক চর্চার বিষয়। আবার কেমন যেন সেসব ধাঁধার মতো মনে হয়। অর্থাৎ চারটেই আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় --

১) কাছ থেকে মানুষকে ঘৃণা করা কঠিন। কাছে যান।

২) বানোয়াট কথাকে সত্য দিয়ে প্রতিহত করুন। পরিশীলিত থাকুন।

৩) হাত বাড়িয়ে দিন। অপরিচিত মানুষের দিকে।

৪) দৃঢ় পিঠ। কোমল বুক। বন্য হৃদয়।

"অরণ্য"

উপাত্ত থেকে আপন হবার ব্যাপারে যতটা স্বচ্ছ ছবি পাওয়া যায় সেখান থেকে বুঝি আপন হতে গেলে মাঝেমাঝে ঝড়তুফানের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে যেতে হবে, যতই সমালোচনা আর পরিত্যক্ত হবার ভয় থাকুক। এই চিত্র দেখে আমার অরণ্যের কথা মনে হয়। ধর্ম, সাহিত্য, কবিতা, শিল্পে আমরা অরণ্যের উপমা পাই। কখনো সেই উপমা এক অদ্ভুত বিপদসংকুল ক্ষেত্র যেখানে আমরা নানা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজে ফিরি। আবার কখনো সে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা জায়গা যেখানে আমরা গভীর কোনো উপলব্ধি আবিষ্কার করি। এই উপমার মধ্যে যা বারবার চলে আসে, তা হল একাকীত্ব, ব্যথা পাবার সম্ভাবনা এবং অনুভুতির, শারীরিক বা আত্মিক উত্তরণের তালাশ।

নিজের কাছে এতোটা আপন হয়েছি যে নিজে বিলকুল একা দাঁড়াতে পারি এই অবস্থা নিশ্চয়ই এক অরণ্যের সঙ্গে তুলনীয়। এ অরণ্য অনিশ্চয়তায় ভরা। এখানে একাকী দাঁড়াতে হয়। তালাশ চালাতে হয়। এ জায়গা যেমন বিপদসঙ্কুল তেমনি অসাধারণ সুন্দর। একে যেমন ভয় করে, আবার এর তালাশ করে মানুষ। এই অরণ্যকে অনিষ্টকারী মনে হতে পারে, কারণ এ আমাদের নিয়ন্ত্রণের অধীন নয়, যেমন নিয়ন্ত্রণের অধীন নয় এই বিশাল প্রান্তরে আমাদের অনুপ্রবেশের পথ কেমন হবে সে নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্তকে কে কেমন ভাবে মূল্যায়ন করছে তা। কিন্তু এই সেই আপন হবার ক্ষেত্র, সব চেয়ে সাহসী আর সব চেয়ে পবিত্র জায়গা আমাদের।

আপন হবার জন্য আমাদের যে সাহস প্রয়োজন, তা শুধু অরণ্যে সাহসী পদক্ষেপ ফেলার জন্যই নয়, বরং খোদ সেই অরণ্য হয়ে ওঠার জন্য। সে সাহস দরকার আমাদের মধ্যেকার দেয়াল ভেঙে ফেলা, মতাদর্শের খুপরি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, এবং দামাল এক বন্য হৃদয় নিয়ে বাঁচার জন্য, ক্লান্ত জখম নিয়ে নয়।

এই দুর্গম জঙ্গলে তো তৈরি রাজপথ মেলে না। যতই অন্য মানুষের এই বনের ভিতর চলার অভিজ্ঞতাকে উপাত্তের ভিতর দিয়ে সংগ্রহ করে নিই না কেন, এর গহীনে প্রবেশ করার পথ নিজেকে চিনতে হবে। যদি কেউ আমার মতো হয়, তবে তার কিছু এলাকা পছন্দ হবে না।

আমাদের স্বেচ্ছায় এমন মানুষের সঙ্গে এখানে সময় কাটাতে হবে যারা আমাদের মতন নয়। সর্বজনীন টেবিলে বসার জন্য তৎপর হতে হবে। জানতে হবে কী ভাবে মন দিয়ে শুনতে হয়, কঠিন বাক্যালাপ চালাতে হয়, আনন্দের তালাশ করতে হয়, বেদনা ভাগ করে নিতে হয়, সুরুক্ষার চেয়ে কৌতূহলের দিকে ঝুঁকতে হয় বেশি, প্রতি মুহূর্ত একাত্মতা খুঁজতে গিয়ে।

সত্যিকারের আপন হবার রাস্তা নিষ্ক্রিয় নয়। একটি দলে নাম লেখানো নয়। খাপে খাপে মিলে যাওয়া নয়। ভান করা নয়। নিরাপত্তা চাই ব'লেই রফা করা নয়। এ এমন অনুশীলন যেখানে আমরা ব্যথা পেতে পারি, যেখানে আমাদের অস্বস্তি হয়, নিজেদের স্বভাব আর পরিচয়কে না বিকিয়ে যেখানে আমরা মানুষের কাছে হাজির হতে পারি। আমরা আপন হতেই চাই, কিন্তু জেনেশুনে কঠিন মুহূর্তকে ডেকে আনার জন্য অসম সাহসের প্রয়োজন।

সাহসী হবার দক্ষতা
অরণ্যে আমরা অপ্রস্তুত চলাফেরা করি না। একটি মারাত্মক সংকটে একা দাঁড়াতে গেলে অথবা কয়েক জন এক সঙ্গে দাঁড়াতে গেলে একটি বস্তুর অতি অবশ্যই দরকার হয় -- সেটি বিশ্বাস। গহীন অরণ্যে পদচারণা করতে গেলে আমাদের বিশ্বাস করতে হয় নিজেকে এবং অপরকে। আমার উপাত্তের সঙ্গে বিশ্বাসের যে-সংজ্ঞা সবচেয়ে বেশি মেলে তা আমি খুঁজে পাই চার্লস ফেল্টম্যানের লেখায়। ফেল্টম্যান বিশ্বাসকে এভাবে তুলে ধরেন, 'একটা কিছু সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত, তা সফল হবে কিনা তা যখন অন্যের কাজের উপর নির্ভর করছে।' তিনি অবিশ্বাসকে এইভাবে তুলে ধরেন, 'আমার কাছে যা জরুরি তা এই মানুষের কাছে সুরক্ষিত থাকবে না।'

বিশ্বাস এমন বিশাল এক জিনিস যে একে মগজ বা হৃদয় দিয়ে বোঝা বড়ো কঠিন। 'আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না' জাতীয় আলোচনা সচারচর ফলপ্রসূ হয় না। তাই আমি বিশ্বাস কথাটাকেই আরো গভীরে খনন করে বুঝতে চাই।

বিশ্বাস বলতে দেখা গেল সাতটি বিষয়কে আমরা বুঝি। আমার উপাত্ত থেকে মিলল এই উত্তর। একে ছোট করে বলতে গেলে বলব 'সাহসী সক্ষম স্বনির্ভর'। এই সারসংক্ষেপ ব্যবহার করতে আমার বেশ লাগে কারণ এতে আমার মনে পড়ে যায় নিজেকে বিশ্বাস করা আর অন্যকে বিশ্বাস করা একটি সাহসী সক্ষম এবং স্বনির্ভর প্রক্রিয়া। এই কথা আমি 'রাইজিং স্ট্রং' (দৃপ্ত উঠে দাঁড়ানো) বইতে আগেই আলোচনা করেছি। আপন হবার প্রশ্নে 'বিশ্বাস'-এর কথা যে ফিরে আসবে এতে আমি বিস্মিত হইনি।

সাধুতা (Integrity): স্বস্তির চেয়ে সাহস শ্রেয় আপনার কাছে। যা শ্রেয়, আর যা সহজ, মজাদার বা চটজলদি, এর মধ্যে আপনি শ্রেয়কে বেছে নেন। যা আপনি প্রচার করেন তা আপনি মেনেও চলেন বটে।

লফ (Vault): যে কথা আপনাকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে, তা আপনি পাঁচ কান করেন না। আমার জানতে হবে আমার এবং অপরের গোপন সংবাদ আপনার কাছে নিরাপদে আছে।

সীমারেখা (Boudaries): আপনি আমার সীমারেখাকে মান্য করে চলেন। যখন সেই সীমারেখা আপনার কাছে পরিষ্কার নয়, আপনি জিজ্ঞাসা করে জেনে নেন। দরকার হলে আপনি কোনও কথার উত্তরে 'না' বলতে দ্বিধান্বিত নন।

হৃদয়তা (Generosity): অপরের কাজ, কথা আর অভিপ্রায় সম্পর্কে আপনি যা ভাবেন, তা পারতপক্ষে সবচেয়ে বেশি উদারতা নিয়ে ভাবেন। সহৃদয় আপনার দেখার দৃষ্টি।

ক্ষম া (Non-judgement): প্রয়োজনে সাহায্য চেয়ে আমি আপনাকে জানাতে পারি, আপনিও পারেন আমাকে জানাতে। আমাদের অনুভূতি নিয়ে আমরা নির্দ্বিধায় আলোচনা করতে পারি। কেউ কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় না চড়িয়ে।

স্বচ্ছতা (Accountability): আপনি আপনার ভুল স্বীকার করেন, ক্ষমা প্রার্থনা করেন, ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন।

নির্ভরতা (Reliability): আপনি যে কথা দিয়েছেন সে কথা রাখেন। তার মানে আপনি আপনার ক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতার দিকে নজর রেখেই কথা দিয়ে থাকেন। যা পারবেন না সেরকম কোনো প্রতিশ্রুতি আপনি দেন না। প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য নানা জরুরি ব্যাপারকে কতোটা শীর্ষে রাখবেন সেই ব্যাপারে আপনার ভারসাম্যবোধ কাজ করে।

নিজেকে বিশ্বাস

অরণ্যে নিজকে বিশ্বাস করার মতো জরুরি আর কী আছে! ভয় আমাদের আনপথে নিয়ে যায় আর ঔদ্ধত্য -- সে যে আরো মারাত্মক! আমরা আগের তালিকায় 'সাহসী সক্ষম স্বনির্ভর'-এর সর্বনাম গুলিকে একটু পাল্টে দিলে দেখব তা কী ভাবে আমাদের নিজেদের প্রতি বিশ্বাসকে মেপে নেবার একটি দক্ষ হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

সাধুতা (Integrity): আমি কি আমার ক্ষেত্রে শ্রেয়, আর স্বস্তিকর, সহজ বা চটজলদির মধ্যে শ্রেয়কে মেনে নিয়েছি? যা প্রচার করেছি তা কি আমি পালন করেছি?

লফ (Vault): যে কথা আমাকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে, তা আমি কি গোপন রেখেছি?

সীমারেখা (Boundaries): নিজের সীমারেখাকে কি আমি রক্ষা করেছি? কোনটা আমার অভিপ্রেত আর কোনটা নয় তা কি আমি পরিষ্কার করেছি?

হৃদয়তা (Generosity): নিজের কাজ, কথা আর অভিপ্রায় সম্পর্কে আমি কি উদারতা দেখিয়েছি?

ক্ষম া ((Non-judgement): প্রয়োজনে কি আমি সাহায্য চেয়েছি? সাহায্য চাইবার সময় কি আমি নিজেকে বিচারের কাঠগড়ায় চড়িয়েছিলাম?

স্বচ্ছতা (Accountability): আমি কি আমার ভুল স্বীকার করেছি, ক্ষমা প্রার্থনা করেছি, ভুলের মাশুল দিয়েছি?


নির্ভরতা (Reliability): আমি যে কথা দিয়েছি সে কথা কি রেখেছি?


তালাশ এবং আপাতবিরোধিতা

আমি প্রায় বলি, মানচিত্র তৈরিতে আমি যত দড়, দুর্গম পথযাত্রী হিসেবে আমি তত সাধারণ -- কারণ পথ চলতে যে কারুর চেয়ে আমি কম টালমাটাল হই না। আমাদের সব্বাইকে পথ হাঁটকে চলতে হয়। গবেষণার মানচিত্র এক হলেও আমাদের চলার পথ ভিন্ন। জোসেফ ক্যাম্পবেল লিখেছেন, "যদি পথটাকে চোখের সামনে পদে পদে আকীর্ণ দেখা যায়, তবে সে তোমার পথ নয়। তোমার পথ তৈরি হয় কেবল তোমার পদক্ষেপে। সেই জন্যই সে তোমার।"

আপন হবার খোঁজকে আমি তাই এভাবে সংজ্ঞাপিত করেছি। এই সংজ্ঞা আমার উপাত্ত থেকে পাওয়া। আমরা আমাদের কাজের ভিতর দিয়ে এক সঙ্গে যেতে যেতে এই পরশমণির কাছে বারবার ফিরে আসব।

"আপন হওয়া এক আত্মিক অনুশীলন। নিজের প্রতি এমন বিশ্বাস রাখা আর এমন ভাবে নিজের মনের মানুষ হয়ে ওঠার অনুশীলন সে, যে নিজের খাঁটি চেহেরাটাই জগতের কাছে তুলে ধরা যায় আর সে ভাবেই কোনো কিছুর অংশ হওয়া অথবা একা দাঁড়ানো -- এই দুই অবস্থায় পবিত্র ঠাই খুঁজে পাওয়া যায়। আপন হতে গেলে নিজেকে বদলাতে হয় না, নিজেকে ঠিক নিজের মতোই হতে হয়।"

এ খোঁজে আমরা একমাত্র যা নিশ্চিত জানি তা হল পথে অনেক আপাতবিরোধী টানাপোড়েন আছে। 'একসঙ্গে' এবং 'একাকী' হবার মতো। আপাতবিরোধী বলতে বোঝায়, "শুনতে ভুল কিন্তু আসলে সত্যি"। আপন হওয়া বাইরে রফা করে মেলার বস্তু নয়। আপন হওয়া আমরা হৃদয়ে বহন করে চলি। কোনো কিছুর অংশ হবার পবিত্রতা এবং একই সঙ্গে অরণ্যের পথে একাকী। মুহূর্তের জন্যও যদি এমন এক ঠাই আমরা খুঁজে পাই তবে 'সবখানে' আর 'কোথাও নয়' এই দুই জায়গায় আমরা আসলে পৌঁছে গেছি। শুনতে অদ্ভুত মনে হয়, কিন্তু এ ঘোর সত্যি।

দার্শনিক কার্ল ইয়ুং বলেছেন আপাতবিরোধিতা আখেরে আমাদের বড়ো আত্মিক সম্পদ। সত্যের আসল চেহারাই আপাতবিরোধী। এখন দেখুন -- পরস্পরের মধ্যে বিরাজমান সংযোগের এই অভাব তো দুনিয়ার এক আত্মিক সংকটই বটে। একে যে এক আত্মিক সম্পদ দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে এতে আমি অবাক হইনি। সত্যের দর্শন পাওয়া প্রায়শ খুব কঠিন, আমরা যখন অরণ্যের গহীনে একা, তখন তো বটেই।

কিন্তু মায়া এঞ্জেলু তো বলেছেনই, "একে চড়া দামে কিনতে হয়। পুরস্কারও অনবদ্য।"

















লেবেলসমূহ: ,

শনিবার, জুন ০২, ২০১৮

সকলকে নিয়ে, সকলকে ছাপিয়ে

সারা জীবন লেগে যায় নিজেকে ভালবাসতে। কখনো গুরু কখনো শিক্ষক কখনো অনুকম্পার হাজার মানুষের কথায় তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আনকোরা স্বকীয় সত্তাটা বুঝতে পারি না। সকলের সঙ্গে এক সুতোয় বাঁধা অথচ "বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা" -- হবার দুরূহ সুন্দর বিপদকে যে আহ্বান করতে পারে, সেরকম মানুষকে অনেক বাধা মেনে চলতে হয়।

মানুষ তার পরিবার নয়, সমাজ নয়, ইস্কুল নয়, মতাদর্শ নয়, সাম্প্রদায়িক চেতনা নয়, তাঁর বন্ধুবৃত্ত নয়, এদের সকলকে নিয়ে, এদের সকলকে ছাপিয়ে, একাকী স্বকীয় হতে পারে -- সেটাই তাঁর সাধনা। আর না পারলে সে বেঁচে থাকে অদৃশ্য জুবুথুবু নিরাপদে, কিন্তু মরে তিলে তিলে।

সেই সকলের আপন অথচ কারুর কাছে বাঁধা না পড়া মানুষ হতে বলেছিলেন আমার এক মাতা। এক বন্ধু আমার। আমাদের।

বলেছিলেন, "যা করবে, নিজে করবে। অন্য কারুর বোঝা দিয়ে কাজ চলে না। সব কিছু নিজেকে ভালো করে বুঝতে হয়। আমিও যদি কিছু বলি আর সেটা তোমার ভুল মনে হয়, সেটা করবে না।"

এমন মা-কে নমস্কার। আমিও এরকম মা হতে, এমন বন্ধু হতে চেয়েছিলাম।

এত দিন পরে ব্রেনে ব্রাউন অনুবাদ করতে গিয়ে, মায়া এঞ্জেলু পড়তে গিয়ে, রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে সেই এক কথাই ফিরে ফিরে পাচ্ছি।

রবীন্দ্রনাথ যখন জালিয়ানওয়ালা বাগের গণহত্যার প্রতিবাদে সকলের নিঃশব্দ মৌনতার মাঝখানে একা দাঁড়ালেন, ব্রিটিশরাজের নাইটহুড ফিরিয়ে দিলেন সে এক মস্ত জয় তাঁর। কিন্তু ওই একা একটি তারাকে সকল তারার বিপ্রতীপে সেদিন একক স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

এমন আরেক মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের ঘোর বিরোধের মাঝখানে মেয়েদের বিদ্যালয় চালু করেছিলেন। বিধবা বিবাহ চালু করেছিলেন।

এমন আরেক মানুষ রাজা রামমোহন রায় সতী দাহ প্রথা রদ করেছিলেন।

বেগম রোকেয়া বাঙালি মুসলমান মেয়েদের পড়াশুনোর জন্য (কোলকাতায়) প্রথম ইস্কুল চালু করেছিলেন।

এমন আরো মানুষ আছে। সমাজ তাঁদের ধিক্কার দিয়েছিল। খুব বিরূপ নিষ্ঠুর সব মিথ্যা প্ররোচনা শুনতে হয়েছে তাঁদের। স্বজন সব সময় পাশে দাঁড়ায়নি। তাঁরা এক একটি তারার মত দাঁড়িয়েছিলেন একক আত্মবিশ্বাসে। সেদিন সব সমাজের ভুলকে তারা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

সত্যের পরে মন আজ করিব সমর্পণ
জয় জয় সত্যের জয়

হৃদয়ের সত্য যে সমাজের সত্য নয় সেটা বোঝাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ গোরা উপন্যাস লিখেছিলেন। এখনো কেউ কেউ এই উপন্যাসকে বাংলার সেরা উপন্যাসের একটি মনে করেন।

বিপদে পড়তে হয়েছিল তাঁদের এইসব একাকী যাত্রায় বারবার।

আজ তাঁদের নিয়ে জয়জয়াকার।

১লা জুন ২০১৮

শনিবার, মে ২৬, ২০১৮

বাংলা ছায়াছবি

একদা উত্তমকুমারকে ত্রিশ বছর বয়েসে আবিষ্কার করেছিলাম।
উত্তমের অভিনয় আগে দেখেও যেন দেখিনি। দেশে ছিলাম কিনা। চাইলেই দেখা যেত। গবেষণার আর জীবিকার ধাক্কা যখন তুঙ্গে আর যখন সাপ্তাহিক সফর ছিল ২০০০ মাইল আর ডোর টু ডোর হপ্তায় ১৪ ঘণ্টা আসাযাওয়া। এই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিনোদনের জগতে ঢুঁ মেরে নিজেকে সামলে নিতে গিয়ে ইংরিজি ছবির চেয়ে পঞ্চাশ ষাট দশকের মিঠে বাংলা ছবিগুলি একে একে জুটিয়ে দেখতে লাগা গেল। উত্তমের অভিনয় বেশ একাডেমিকালি দেখা। যাকে বলে খুঁটিয়ে। পরিচালক হলে হয়তো বড়ো উপকার পেতাম। তবে এসব অকারণ পর্যবেক্ষণে বড়ো আনন্দ পেয়েছি। বাংলা ছায়াছবির জগৎ দরিদ্র ছিল এই অপবাদ কেউ দিতে পারবে না। এমন কি যাঁদের কথা কেউ বলে না সেই তরুণ কুমার, অনুপ কুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়, জহর রায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমা গুহ ঠাকুরতা, মলিনা দেবী, ছায়া দেবী, রবি ঘোষ আর যাঁদের কথা সকলে বলে সেই সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, মালা সিনহা, শরমিলা ঠাকুর, মাধবী মুখোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, পাহাড়ী সান্যাল প্রমুখের এমন ভক্ত হলাম যে শুধু সেই কারণে ওই সর্বস্ব বিপর্যস্ত করা ৪ বছর ধরে গতায়াত আমরা একটা ইতিবাচক কারণে মনে রাখতে পারব।

*যারা অনাবিল আনন্দ চান তারা বাংলা ছায়াছবির কিছু বাছাই তালিকা দেখতে পারেন। অখ্যাত তালিকায় আছে সাড়ে চুয়াত্তর, গলি থেকে রাজপথ, হাত বাড়ালেই বন্ধু, সদানন্দর মেলা, ওরা থাকে ওধারে, গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি

২৬ মে ২০১৮

সোমবার, মে ২১, ২০১৮

হারকিউলিস

এমন জলদ্গব অবস্থা। বৈশাখে জলজ বিপর্যয়। ভেনিস হতে চাওয়া আপগ্রেডেড নগরী।

বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ায় এসব অকাল অসুখ। সমুদ্রে নদীতে প্লাস্টিকের নিষ্কাশন, মাছের প্লাস্টিক খেয়ে নেতিয়ে পড়া, মাটির অন্তরে লোহা ড্রিল করে দালান বানানো আর ভূমিদস্যুর দখলে ধরিত্রী-বসুন্ধরার পবিত্রতা, আর তারা কোটি কোটি পেশীশক্তিহীন মানুষ চরাচরহীন থই থই বর্ষার তেলঝরা আকাশের নিচে ভিজছে।

অথচ একটি মাত্র মানুষের কাছে সে অনিকেত পৃথিবীতে একমাত্র আবাস। বিক্ষত শরীর আর মন নিয়ে হাসার জন্য তার কাছে সে দায়বদ্ধ। আর সে ভাবেই 'জীবন হয় সুন্দর'।

ঠুনকো অস্তিত্বের হাতল ঘুরে গিয়ে রাস্তায় উল্টে পড়লেও, টালখাওয়া যন্ত্রের নিচে চাপা পড়ে চিৎকার করলেও যে কেউ আসবে না, সেটা জেনেই ভালবাসার মহানতার কথা বিশ্বাস করে যাওয়া। এক ছোট চোখ জোড়া লক্ষ করবে আর আর্তি জানাবে, 'মা, তুমি কি মরে যাচ্ছ? প্লিজ মরে যেও না।' সেইসব শোনার হাহাকার, গৌরব, অস্তিত্বের হাড় ফুঁড়ে যাওয়া লোহার কাঁটা, রক্ত, টিটেনাসের ঘায়ে না পড়ার জন্য বর্ষাস্নাত কর্দমমগ্নতাই। দালানের গা এমন সাউণ্ডপ্রুফ যে কুকুর আর মানুষ চিৎকার করুক, সেই শব্দ কেউ শুনতে পাবে না।

একটা দুটো আকাশের ফুটো দিয়ে যে তারা দেখা যায়, যেই তারায় বাইসাইকেল থিফ থাকে, থাকে চার্লস চ্যাপ্লিন আর তাঁর কিড, এক বিশাল নীলাভ তিমি মানুষকে হাঙরের দাঁত থেকে বাঁচায় সেখানে, সেখানে এক বৃদ্ধা গুডল আফ্রিকার জঙ্গলে থাকেন তাঁর বেবুনদের নিয়ে, এক রাজসিক রাজহাঁস ছুটতে ছুটতে এসে এক মানবীর গলা জড়িয়ে ধরে আপামর ডানায়, সে সব শুধু ফিল্ম শট নয়। হাল ছেঁড়া ব্যথা নিরুদ্দেশে যেতে দেখে কাউকে ধরে ফেলা। সে সব এই চেনা গলির কাহিনী কবে হবে? হবে কি?

না চাহিলে যারে পাওয়া যায় অভূতপূর্ব ব্যতিক্রমে; চাইলে যা মেলে না চেনা জগতের অবয়বে সেই ক্লিশে শব্দ আর অর্থহীন হয়ে যাওয়া বাসি নেতার মত কথাটা, মানবতা, ঠোঁটে নিয়ে ফিরছে কে? ফিলম ডিভিশনের লোক ছাড়া।

জাহান্নামে যাক - বলতে চেয়ে এক মায়াবী জগত-কে এক হাতে ধরে সে। অন্য হাত হয় হারকিউলিসের।

কথাগুলি বলার অবকাশ নেই। আকাশে বিন্দু বিন্দু নিয়তি নেহাত নির্বাক।

২১ মে ২০১৮

বুধবার, মে ০৯, ২০১৮

ভিক্ষা না নিবি

"ভিক্ষা না নিবি তখনই জানিবি
ভরা আছে তোর ধন
খুলে দেখ দ্বার অন্তরে তোর আনন্দ-নিকেতন"

রবীন্দ্রনাথ নিজেকে নিজের কাউন্সেলিং করছেন, কোচিং করছেন (বন্যাদির একটা সাক্ষাৎকারে এ শব্দটা ব্যবহার করতে দেখে বেশ মজা লাগল। আমিও করি। এ দেশে কাউন্সেলিং নিয়ে একটা সামাজিক ট্যাবু আছে)। গান-টা হল 'আপনারে দিয়ে রচিলি কি এ আপনারই আবরণ..

সেন্স অভ স্কেয়ারসিটি (কিছু তো যথেষ্ট নেই, হল না, হবে না এই বোধ) থেকে মুক্ত হবার কথা বলছেন। অবশ্যই নিজেকে বলছেন।

৮ মে ২০১৮

লেবেলসমূহ: ,

রবীন্দ্রনাথ সকলের

১) নামজাদা রবীন্দ্র-ভাবাপন্ন একটি সংগঠন আর বাংলাদেশের সামগ্রিক রবীন্দ্রচর্চা -- সমার্থক নয়।

কখনো কখনো এক একটি মানুষ এমন বড়ো মাপের হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্র ভাবাদর্শ নিয়ে যে রবীন্দ্র চর্চা বলতে সকলে তাকে বোঝেন। কিন্তু, ক্রেডিট দিয়েও বিনীত নিবেদন এই যে রবীন্দ্রচর্চা কখনো কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা মানুষে সীমিত ছিল না। হবেও না। রবীন্দ্রনাথ নিজে গণতান্ত্রিক ছিলেন। নাহলে 'আমরা সবাই রাজা' গানটা লিখতেন না।

২) আমাদের রবীন্দ্রচর্চার জগত দল আর ব্যক্তির করায়ত্ত না হয়ে মুক্তমঞ্চ হয়ে উঠবে। সব গুণীর চিন্তকের কর্মীর সেখানে কদর হবে এই আশা রাখি।

৩) নির্দিষ্ট সংগঠনের গৌরব যেমন তাঁরা নেবেন, তেমনি না পারার ব্যর্থতা, আর ভুলের দায় দায়িত্ব তাঁরা বুঝবেন। জবাবদিহিতা থাকতে হবে। বন্ধুসুলভ আলোচনা থাকতে হবে।

৪) ইতিমধ্যে বলার এই যে -- রবীন্দ্র চর্চা মানে শুধু গান আর আবৃত্তি কি?

মাঝখান থেকে তাকে পাঠের বিষয়টা প্রায় হাওয়া হয়ে গেছে। পাঠের জন্য লাগে একটা বই, একটা পড়ার টেবিল আর এক জোড়া চোখ। তা অনেকেরই আছে।

৫) রবীন্দ্রনাথে বিশাল এক সমুদ্র নাটক আছে। গদ্য নাটক, গীতিনাটক, নৃত্য নাট্য। আমরা ঢাকার 'নাগরিক' গোষ্ঠীকে 'অচলায়তন' করতে দেখেছি রাজশাহীর মঞ্চে বেশ ছোটবেলায়। অচলায়তন, রক্তকরবী, মুক্তধারা ইত্যাদি নাটকগুলি কেন করা হয় না জানি না। আমরা তাসের দেশ আর ফাল্গুনী বহু বহু বার মঞ্চস্থ হতে দেখেছি খুলনার হাদিস পার্কে। জনমঞ্চে। এবং গ্রামে ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত উদ্যোগে। রবীন্দ্র চর্চা নিয়ে যারা বলবেন তাদের এই সব প্রত্যন্ত জায়গার খুঁটিনাটি খবর জোগাড় করতে হবে বইকি।

৬) আমাদের ইচ্ছে তাকে ড্রয়িং রুম কালচার থেকে বের করে আনা হোক। সংগঠনের শাখা প্রত্যন্ত জায়গায় ডালপালা মেলুক এবং তাদের কাজের স্বীকৃতি পাক।

৭) রবীন্দ্রনাথ নিজে অন্যকে দোষ চাপিয়ে বেশি সময় কাটাননি। হাড়ভাঙ্গা ১২-১৩ ঘন্টা নিখাদ কাজ করে সারা জীবন কাটিয়েছেন। আমাদের কালচারে এই পরচর্চা পরনিন্দার ভাগ কমিয়ে আসল কাজের ভাগ বাড়াতে হবে।

'সবারে করি আহ্বান / এসো উৎসুক চিত্ত / এসো আনন্দিত প্রাণ'

রবীন্দ্রনাথ সকলের। তার স্থান হোক আমাদের পড়ার টেবিলে। আমাদের চায়ের আড্ডায়। আমাদের মুক্তমঞ্চে। আমাদের শিশুদের কণ্ঠে। আমাদের প্রাত্যহিক কাজে। এই দাবী হতে পারে তার জন্মদিনে। আমার বিনীত মত এই --

২৫ শে বৈশাখ ১৪২৫

লেবেলসমূহ:

রবিবার, এপ্রিল ২৯, ২০১৮

কবিতাও সেই রকম

তার একজন লেখক-আইডল আছেন যিনি কবিতা ভালবাসেন না। কবিতার কথা বলতে গেলে যিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান। আসলে সমস্যাটা এই -- নাবাল মাটির ঘাসের মতো ভিজে নরম মরণহীন সব কবিতা তিনি প্রকাশ করতে লজ্জা পান। নিজের কাছেও। ছোটকালে নাকি লিখতেন সেই সব। আজ আবার লেখেন। শুধু নিজের জন্য। লাজুক পাতার মতো নিরাভরণ নিজস্ব নির্জনতা সেই সব। কাউকে দেখানো যায় না।

শৈশব কৈশোর আর যৌবনের বাইরে এক দিন সে ফিরে এসে দেখে, কবিতার বারবাড়ি এখন এঁদো সুনীল ধ্বংসস্তুপ। ফাঁকে অশ্বত্থের চারা, দেওয়ালের ফাটলে লোনা গন্ধের ইঁদুরেরা বাসা বেঁধেছে। বাদুড়, সাপ, গিরগিটি আর বেড়াল ভালোবাসে সেই ঠিকানাহীনতা। গোছগাছহীন এক মধ্য জীবনের মতো। হারিয়ে যাওয়া কোনো খাতা, সব আগুনে পুড়ে গেলে, যা সে ঠিক আগলে রাখত এক দিন, সেই খাতা এখন ঘুনের মাংস। আরেক দিন অটো থেকে নেমে জানা যায় সেই বীলিয়মান, দুর্জয় স্তূপও আর নেই। ভূমিদস্যুর বুল ডোজারের কাছে পরাস্ত হয়ে গেছে। এখন এখানে পানের বরজ। অনন্ত প্রান্তর, দোহারা ভূমির অবয়ব খোপ-কাটা। সেই পান বিক্রি হয়ে টাকা আসে।

কেউ কেউ শিয়রের কাছে মধু তুলসীপাতা রেখে দিয়েছে। সে দেখল রুপালি, সোনালি, মাছের চোখ। আঁশে নদীর স্রোতের সাহসী রেখা। সে দেখল নক্ষত্রের চোখ চূর্ণ হয়ে আলো ঝরে। পাহাড়ের শিঙের ডগায় মেঘ ঝোলে। পাখির ঠোঁটে খড়, বাসা বাধার মৃত্যুঞ্জয় আকাঙ্ক্ষারা।

মানুষ মরে গেলে সবখানে ছড়িয়ে যায়। কবিতাও সেই রকম।

৩০ এপ্রিল ২০১৮

শনিবার, এপ্রিল ২১, ২০১৮

ব্রেনে ব্রাউন (১ম অধ্যায়) সবখানে আবার কোথাওই নয়

আমি লিখতে শুরু করেছি কিন্তু ভয় আমাকে অজগরের মত গিলছে। তার কারণ বিশেষ করে এই যে আমি আমার গবেষণা থেকে যা পেলাম আর যা বলতে যাচ্ছি তা বহু দিনের বিশ্বাস আর ধারণাকে অসমর্থন করবে। এমন যখন হয়  আমি তখন ভাবতে থাকি -- এ সমস্ত বলার আমি কে? অথবা আমার কথা শুনে কি মানুষ খুব খেপে যাবে? বিরক্ত হবে?

এই ব্যথা-পেতে-সক্ষম এক অবস্থানে, আমি সেই সব অগ্রগামী সাহসী মানুষের কাছে প্রেরণা খুঁজি যারা সমাজকে গুরুতর নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। যাদের সাহসিকতা ছোঁয়াচে। আমি তাদের সম্পর্কে যা হাতের কাছে পাই তাই-ই দেখি বা পড়ি -- বই, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ। এমনটা করি কারণ আমি যখন ভয়ের মধ্যে বসবাস করি তখন ওরাই তো এসে আমাকে উৎসাহ দেয়, এগিয়ে যেতে বলে। আর তার চেয়েও বড়ো কথা, আমার ঘাড়ের ওপর আমার নজর রাখতে গিয়ে ওরা আমার লেখায় এক আখর বাজে কথা সহ্য করে না।

এমন হয়ে উঠতে সময় লাগে। আমার জীবনের প্রথম দিকে, আমি উল্টো পথে ছিলাম। আমার মন সমালোচক আর নেতিবাচকদের কথায় ভারাক্রান্ত ছিল। আমি লিখতে বসে আমার সব চেয়ে অপছন্দের অধ্যাপক, সব চেয়ে নাক-সিটকানো কলিগ, সব চেয়ে ক্ষমাহীন অন-লাইন সমালোকদের মুখ কল্পনা করে নিতাম। আমি যদি এদের খুশি করতে পারি বা চুপ রাখতে পারি, আমি ভাবতাম, তাহলেই চলবে। এর পরিণতি একজন গবেষক বা সমাজ-বিজ্ঞানীর জন্য ভয়াবহ: এমন কিছুই তাঁকে আবিষ্কার করতে হবে যা বর্তমান ধারণার সঙ্গে ভাঁজে ভাঁজে মিলে আছে, কাউকে যা আলোড়িত করে না; যা নিরাপদ, পরিশ্রুত, স্বস্তিকর। তবে এগুলো সত্যি কথা নয়। খুশি করার ভেট মাত্র।

সুতরাং আমি ঠিক করি এই নেতিবাচক লোকদের, এই ভয়দেখানো জুজুদের আমার দরকার নেই। তাদের বদলে আমি ডাকতে শুরু করি সেই সব পুরুষ, নারী, যারা সাহসের মধ্যে দিয়ে দুনিয়াটাকে গড়েছে। আর কখনো কখনো তা করতে গিয়ে লোকজনকে খেপিয়ে তুলেছে। তাঁরা এক বিচিত্র দল। জে কে রাউলিং, আমার ভীষণ প্রিয় হ্যারি পটার বইয়ের লেখককে আমার প্রায়শ দরকার হয় -- যখন আমার গবেষণায় নতুন, অদ্ভুত ধারণার ভুবনকে তুলে ধরতে হবে। আমি কল্পনা করি তিনি বলছেন: নতুন ভুবন খুব জরুরি, কিন্তু বর্ণনা করলেই হল না। সেই ভুবনে যে গল্প আছে, তাই দাও আমাদের। সেই ভুবন যতই উদ্ভট আর আশ্চর্য হোক না কেন, সেই সব গল্পে আমরা নিজেদের দেখতে পাব

যখনই জাত, লিঙ্গ বা শ্রেণী নিয়ে কোনো বেদনাদায়ক আলোচনা এসে যায় তখন লেখক এবং এক্টিভিস্ট বেল হুক্সকে আমার দরকার হয়। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন শিক্ষকতা এক পবিত্র কাজ এবং শিক্ষা গ্রহণের সময় যে অস্বস্তি, সেটাও জরুরি। এছাড়া এড ক্যাট্মুল, কেন বার্নস আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমি গল্প বলার সময় কানে ফিসফিস করেন। আমি যখন ধৈর্য হারিয়ে সংলাপ থেকে ডিটেল বাদ দিতে থাকি তাঁরা আমাকে একটু ঠেলা দেন। "আমাদের তোমার গল্পের ভিতর নিয়ে যাও," বলেন তাঁরা। অনেক সংগীত-ওস্তাদ আর শিল্পীরা এসে যান, আসেন ওপ্রা উইনফ্রি। তাঁর কথা আমি আমার পড়ার ঘরের দেয়ালে সেঁটে রেখেছি। 'ভেবো না তোমার কাজ, তোমার জীবন সাহসী হবে এবং কাউকে তা হতাশ করবে না। এমন হয় না কখনো।'

কিন্তু আমার সবচেয়ে একনিষ্ঠ মন্ত্রণাদাত্রী হলেন মায়া এঞ্জেলু।  কলেজে কবিতা পড়তে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তাঁর কবিতা "স্টিল আই রাইজ" (তবু আমি জাগি) আমার জীবনের সবকিছু ওলোটপালোট করে দিয়েছিল। এর মধ্যে এমন এক শক্তি আর সৌন্দর্য ছিল যে আমাকে তাঁর প্রতিটি বই সংগ্রহ করতে হয়। তাঁর সব কাব্য, সব সাক্ষাৎকার আমি পড়েছি। তাঁর লেখা আমাকে সামনের দিক ঠেলে দেয়, নিরাময় আনে। তাঁর কাজ আনন্দে ভরা কিন্তু এক তিল রেহাই দেয় না।

কিন্তু তাঁর একটি উদ্ধৃতির সঙ্গে আমি গভীরভাবে ভিন্নমত ছিলাম। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণ এবং শ্রেণী নিয়ে একটি কোর্স পড়ানোর সময় উদ্ধৃতিটি আমার সামনে আসে। ১৯৭৩ সালে বিল ময়ারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে টেলিভশনে মায়া বলেন:

"আমরা কেবল তখন মুক্ত যখন আমরা অনুধাবন করি, কোনো ভুবন আমাদের আপন নয় -- সব ভুবন আমাদের আপন -- সেটা কোনো ভুবন নয়। এর জন্য চড়া দাম দিতে হয়। পুরস্কারও অনবদ্য।"

লেখাটা পড়ে আমার কী মনে হয়েছিল হুবহু মনে আছে: "দারুণ একটা ভুল হচ্ছে এখানে। আপন ভুবন যদি না থাকে -- তেমন দুনিয়া কেমন হবে? কতোগুলো নিঃসঙ্গ মানুষের জটলা শুধু! আমার মনে হয় মায়া একাত্ম হওয়া, আপন হবার শক্তিকে বুঝতে পারছেন না।"

পরবর্তী বিশ বছর ধরে সেই উদ্ধৃতি যখনই উঠে এসেছে আমার জীবনে, আমি এক রাশ ক্রোধ অনুভব করেছি। "কেন এমন কথা বললেন তিনি? এটা ঠিক হতেই পারে না। আপন হওয়া, একাত্ম হওয়া খুব জরুরি। আমদের কিছুর সঙ্গে, কারুর না কারুর সঙ্গে, কোথাও না কোথাও আপন হতেই হবে।" বুঝতে পারি দুই কারণে আমার এমন রাগ হচ্ছে। প্রথমত, ডক্টর মায়া এঞ্জেলু আমার কাছে এমন এক কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন, যে তাঁর সঙ্গে এমন এক মৌলিক জায়গায় আমাদের দ্বিমত থাকবে, এ আমি মেনে নিতে পারছি না। দুই, আমরা কোনো জায়গায় খাপে খাপে এঁটে যাব না, আপন হব না, এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনার অন্যতম। আমার ব্যক্তিগত পরিণত জীবনের  বড়ো কষ্টের জায়গা।

তাই মায়ার এই উদ্ধৃতি কখনোই আমাকে মুক্তি দিতে পারে না।

কোথাও আপন হতে না পারা আমার জীবনকে দাগ দিয়ে গেছে। আমি নিউ অরলিন্সে কিন্ডারগার্টেন ইস্কুল গেছি। সালটা ১৯৬৯। শহরটা যত সুন্দর হোক (এখনো খুব সুন্দর) বর্ণবাদ এখানে বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। বর্ণভিত্তিক ইস্কুলগুলি মিলিয়ে মিশিয়ে এক করে ফেলা হয়েছে সে বছর। ঠিক কী যে হচ্ছে আমার পক্ষে তা আদৌ বোঝা সম্ভব না -- আমি বড্ড ছোট। কিন্তু আমি জানি আমার মা খুব সোচ্চার আর বলিষ্ঠ লোক। তাঁর আশেপাশে দাঁড়িয়ে সেই তেজ আমি অনুভব করি। কিন্তু আমার কাছে আমার মা আমাদের পাড়ায় নামের-তালিকা-তৈরি-করা একজন সেচ্ছাসেবী। তিনি আমার আর আমার পুতুলের জন্য হলুদ ফ্রক সেলাই করেন।

আমরা আদি বাড়ি টেক্সাস ছেড়ে যাই, এবং এই দেশ ছাড়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। আমার দিদিমার জন্য আমার মন কেমন করে। কিন্তু একই সঙ্গে আমি আমার বাড়ির চারপাশে বন্ধুত্ব পাতাবার জন্য ব্যস্ত। আমাদের পাড়ায় আবার নামের তালিকা দেখেই আদ্যোপান্ত সব কিছু ঠিক করা হত। কোন অনুষ্ঠানে কে কে হাজির, থেকে শুরু করে কোন জন্মদিনে কাকে কাকে ডাকা হবে অব্দি। এক দিন আমার মা'র এক বন্ধু তাঁর চোখের সামনে তালিকাটা হাওয়ায় নাড়িয়ে বললেন, 'এই পাড়ার কালো মেয়েদের নাম দেখেছ? সবার নাম ক্যাসান্দ্রা দিয়ে শুরু!'

বেশ! আমার মা ভাবেন। এই কারণেই হয়ত আমি আমার সমস্ত শাদা বন্ধুদের জন্মদিনের নেমন্তন্ন থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছি! আমার মায়ের প্রথম নাম ক্যাসান্দ্রা। আমারও প্রথম নাম ক্যাসান্দ্রা। পাড়ার তালিকায় আমার নাম? ক্যাসান্দ্রা ব্রেনে ব্রাউন। যদি কোনো আফ্রিকান আমেরিকান এই লেখা পড়েন, তিনি জানবেন ঠিক কেন আমাকে শ্বেতাঙ্গ বন্ধুদের জন্মদিনে ডাকা হয়নি। একই কারণে আফ্রিকান আমেরিকান একটি দল আমাকে অধ্যাপক-বেলায়, বছর শেষে একটা কার্ড দেয়। তাতে লেখা: "বুঝলাম। তুমি আসলে ব্রেনে ব্রাউন।" নারী ইস্যুর ওপরে আমার একটা কোর্সে তারা নাম লিখিয়েছিল। আমি যখন ক্লাসে পড়াতে ঢুকি তারা আশ্চর্য হয়ে প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যায় আর কি! "আপনি ক্যাসান্দ্রা ব্রেনে ব্রাউন নন?" হ্যাঁ, বটেই তো। একই কারণে আমি যখন ছোট একটা আধবেলার কাজের ইন্টারভিউতে যাই, আমাকে দেখে সেখানে এক মহিলা বলে ওঠেন, "তুমিই ব্রেনে ব্রাউন! কী অবাক কাণ্ড! খুশি হলাম!" বসার আগেই সেই ইণ্টারভিউ থেকে আমি বেরিয়ে আসি।

কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলি আমাকে অভ্যর্থনা জানায়, কিন্তু তাদের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় তাদের চোখ যে কপালে উঠছে তা টের পাওয়া যায়। আমার এক বন্ধু জানায় আমি তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা প্রথম শাদা রঙের মানুষ। চার বছর বয়েসে এই কথার মর্ম বোঝা কঠিন, বিশেষ কর বন্ধুর বাড়িতে জন্মদিনের কেক খেতে এসে। কিন্ডারগার্টেনে সবার সঙ্গে একাত্ম হওয়া খুব সহজ হবার কথা, অথচ আমার সবসময় মনে হত আমি বাইরের লোক।

পরের বছর বাবার চাকরি-সূত্রে আমরা অন্য শহরে চলে যাই। আমাকে হোলি নেম অভ জিজাস নামের এক ক্যাথোলিক ইস্কুলে ভর্তি করা হয়। দেখা যায় সেই ইস্কুলে একমাত্র আমিই ক্যাথোলিক নই। আরও দেখা যায়, সেই ইস্কুলের পক্ষে আমার ধর্মটা সঠিক হয়নি। আবার আপন হওয়ার স্বপ্নে বাদ সাধে। এক দুই বছর বাইরে ব'সে কাটানো, আলাদা করে ডেকে নেওয়া, এবং মাঝেমধ্যে একা পড়ে যাবার পর একদিন দেখি ঈশ্বর আমাকে অফিসে ডেকে পাঠাচ্ছেন। অন্তত তাঁকে দেখে আমার তেমনটা মনে হয়েছিল। আসলে তিনি বিশপ। তিনি এক ধর্মগ্রন্থ আমার হাতে তুলে দিয়ে প্রতিটা লাইন পড়ে আমাকে শোনান। পরে তিনি আমাকে একটা চিরকুট দিলেন বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। সেই চিরকুটে লেখা, "ব্রেনে এখন থেকে ক্যাথোলিক"।

সে যাই হোক, পরের দুটো বছর মোটেও মন্দ কাটল না কারণ আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী এলেনোর তেমন তেমন মেয়ে ছিল। কিন্তু এর পর শুরু হল বাসস্থান পরিবর্তন। তখন আমি চতুর্থ শ্রেণীতে। হিউস্টন থেকে ওয়াশিংটন ডি সি যখন যাওয়া হয় তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে। আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে তখন আমরা আবার হিউস্টন ফিরে আসি। বয়ঃসন্ধির জুবুথুবু ভাবের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন-মেয়ে হিসেবে নতুন জায়গায় মেলার চেষ্টা। এইসবের মধ্যে বাঁচোয়া -- আমার বাবা মার সম্পর্ক ভালো ছিল। আমার আশেপাশের নানা ঝড়ঝঞ্ঝা, ইস্কুল পালটানো, নতুন বন্ধু, নতুন মানুষের ভিড়ে আমার বাড়ি এক নিরাপদ আশ্রয়। কোথাও আপন না হবার ফলে সেটাই ছিল আমার ভরসার জায়গা। সব যখন ব্যর্থ, তখন আমি মা বাবার আপন ছিলাম।

কিন্তু সে শান্তি টিকল না। হিউস্টনে ফিরে আসার পরে আমার মা বাবার ভিতরে অনেক দিনের এক বেদনাদায়ক দ্বন্দ্ব শুরু হল -- শেষ পর্যন্ত যা তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই চরম বিশৃঙ্খলার ঠিক মাথায় ছিল আমার ইস্কুলের ড্রিলের টিমের স্বপ্ন।

অষ্টম শ্রেণীর শেষে ফিরে হিউস্টনে এসে যেটুকু সময় মেলে, তার মধ্যে আমি হাইস্কুলের ড্রিল টিমে যোগ দেবার জন্য নাম লিখিয়েছিলাম। সেই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। বাড়িতে আমার ঘরের দেয়ালের ওপার থেকে যখন আমার মাবাবার তর্কের চাপা শব্দ শুনছি তখন এই ড্রিল টীমের স্বপ্ন আমার সুরক্ষা হয়ে উঠছে। তার আগে আট বছর ধরে আমি ব্যালে শিখেছি -- সে শিক্ষা বৃথা গেল না। এই ড্রিল টিমে ঢুকতে চেয়ে আমাকে তরল খাদ্যে যেতে হল -- বাধাকপির স্যুপ আর জল। নাহলে নাকি ওজন বাগে আসবে না। বারো বছর বয়েসে কাউকে ওজন ঠিক করতে এই খাদ্য খেতে হয়েছে, শুনতে অদ্ভুত লাগে। কিন্তু আমার কাছে একে স্বাভাবিক মনে হয়।

আমার এখনো মনে হয়, এই ড্রিল টিমে ভর্তি হতে চাওয়াই আমার জীবনের সেরা স্বপ্ন ছিল। এতটাই চেয়েছিলাম। এই ড্রিল নাচ আমার কাছে যেন নিখুঁত, নির্ভুল, সুন্দর একটা কিছু। আমার পরিবারের ডামাডোল থেকে যোজন দূর। এখানে থাকা যেন আপন হবার পবিত্র সোপান। এখানে একজন 'বড়ো বোন'  আমার লকার সাজিয়ে রাখত। আমরা একে অপরের বাসায় সখীর মত রাত কাটিয়েছি। ফুটবল প্লেয়ারদের সঙ্গে প্রেম করেছি।

এবং আক্ষরিক ভাবে, এই ড্রিলের মধ্যে দিয়ে আমরা একমন একপ্রাণ হয়ে একটা কাজে অংশ নিতাম -- সেটা  নাচ। তাই এই জীবন আমার আপন হবার পূর্ণাঙ্গ ছবি ব'লে মনে হত।

আমার তখনো কোনো বন্ধু হয়নি। রুটিন শেখা সহজ ছিল। আমি এতটাই চর্চা করেছি যে ঘুমের মধ্যেও নাচতে পারি।

পরীক্ষার দিন আমার ভয়ে কাঁপুনি এল। জানি না সেই দুর্ভিক্ষের খাদ্য না স্নায়ুর গড়বড়। আমার মাথা হালকা লাগছিল। মা আমাকে ইস্কুলে দিয়ে এলেন। এখন নিজে মায়ের ভূমিকায় এসে পড়েছি; তাই বুঝতে অসুবিধে হয় আমার সে দিন কেমন লাগছিল, যখন সকলে হাত ধরাধরি করে দৌড়ে ঢুকছিল, আর আমাকে কেমন একা একা ঢুকতে হয়। তবে আমি চটজলদি বুঝতে পারি একা ঢোকার চেয়ে ঢের কঠিন সমস্যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

সব মেয়ে -- সত্যি বলছি প্রত্যেকেই -- পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সেজেগুজে এসেছে। মাথায় নীল সোনালি ফুল-কাটা ফিতের ছড়াছড়ি। তাদের মুখে রঙ, পাউডার, কাজল, ইত্যাদি। আমার মুখে কোনো প্রসাধন নেই। আমার জামার রঙ ছাই। ওদের গায়ে নীল আর সোনালি জামা। কেউ আমাকে বলেনি আজ ইস্কুলের রঙে সেজে আসতে হবে। সবাই কেমন উজ্জ্বল আর চকচকে। তার মধ্যে আমি যেন সেই দুঃখী মেয়ে যার বাবা-মা কেবল লড়াই করে।

নির্ধারিত ওজনের চেয়ে আমার ওজন ৬ পাউণ্ড কম দেখা যায়। তারপরও অনেক মেয়ে ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে লকার ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ার দৃশ্য আমাকে আতংকে ফেলছিল।

আমাদের জামায় সেফটি পিন দিয়ে নম্বর আঁটা আছে। পাঁচ অথবা ছয়ের দল হয়ে আমরা নাচ করলাম। মাথা হালকা লাগছিল তো কী, রুটিনে আমার কোনো ভুল হল না। মা যখন তুলে নিতে এলেন, আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গেলাম। অপেক্ষার সময়টা অহেতুক কাটতে চাইল না।

শেষে, বিকেল ছয়টা বেজে পাঁচে, আমরা সকলে মিলে আসি। মা, বাবা, ভাই, বোন। আমি নম্বর দেখে নেব। তারপর আমরা সকলে আমার দিদিমার কাছে বেড়াতে যাব। পোস্টার বোর্ডে টাঙানো পাশ করা মেয়েদের নম্বরের তালিকা ঝুলছে। আমার দলের একজন আছে। সবচেয়ে উজ্জ্বল আর চকচকেদের মধ্যে একজন। নাম ক্রিস। এমন নাম আমাদের সকলেরই অভীষ্ট। ছেলে না মেয়ে বোঝা যায় না।

নম্বরগুলি ছোট থেকে বড়ো করে সাজানো। আমার নম্বর ৬২। ষাটের ঘরে আমার নজর দৌড়ায়। ৫৯, ৬১, ৬৪, ৬৫। আমি আবার তাকালাম। কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না। যেন ওইদিকে আরও ভালো ভাবে তাকিয়ে থাকলে ৬২ নম্বরটা দেখা যাবে। এমন সময় ক্রিসের চিৎকারে আমার ঘোর কেটে গেল। সে ওপর-নিচ লাফাচ্ছে। আমি কিছু বোঝার আগে তার বাবা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে এসে তাকে উঁচুতে তুলে এক ঘুর দিয়ে দিল, ছবিতে যেমন হয়। আমি পরে শুনতে পেলাম ভিতরকার খবর ; আমার নাচ ঠিক হলে কী হবে। আমার মাথায় ফিতে নেই। চকচকে উজ্জ্বল জামা কাপড় নেই, প্রসাধন নেই। দল নেই। আপন বলতে কেউ নেই আমার। আমি তাই এই দলের অযোগ্য।

একা! ভিতরে ভিতরে আমি ধ্বস্ত হতে থাকি।

আমি গাড়িতে গিয়ে উঠি আর বাবা চালাতে শুরু করেন। আমার মা বাবা একটা কথাও কইলেন না। সেই নৈঃশব্দ্য আমার বুকে ছুরির মতো বিঁধল। তাঁরা আমাকে নিয়ে লজ্জা পাচ্ছেন। আমি তাঁদের মুখ রাখতে পারিনি। তাই লজ্জা পেয়েছেন। আমার বাবা ফুটবলের ক্যাপ্তেন ছিলেন। আমার মা তাঁর ড্রিল টিমের নেত্রী ছিলেন। আমি কিছুই না। আমার বাবা বিশেষ করে চাইতেন সকলে দেখুক, চাইতেন সামাজিক অবস্থানে আমরা খাপ খাইয়ে নেব, নেতৃত্ব দেব। আমার দেখানোর মতো কিছু নেই। আমি খাপ খাওয়াতে পারছি না।

প্রথমবারের মতো আমি আমার পরিবারের কাছে আপন হতে পারলাম না।

আমার ড্রিল টিমের গল্প পৃথিবী জোড়া অনেক বড়ো বড়ো সমস্যার মধ্যে উন্নত বিশ্বের এক ছোট সমস্যা হিসেবে খারিজ করা যায় নিশ্চয়ই। কিন্তু এই সমস্যা আমার কাছে কেমনতর ছিল একটু বলি। জানি না গল্পটা সত্যি কিনা, নাকি আমি বানিয়ে তুলেছিলাম সে গল্প, কিন্তু সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে আমি নিজেকে বলছিলাম, আমি আর আমার পরিবারের কেউ না, আমাদের সামাজিক সব চেয়ে মৌলিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি অন্তরে বহিরাগত হয়ে গেছিলাম। আমার বাবামা যদি আমাকে সেই মুহূর্তে জানাতেন, আমি চেষ্টা করে যথেষ্ট সাহসিকতা দেখিয়েছি, অথবা সত্যি তখন আমি যেমনটা চাইছিলাম, পাশে ডেকে যদি বলতেন -- আমার এই অভিজ্ঞতা কতো বেদনাদায়ক; বলতেন, সত্যি ওই দলে থাকার যোগ্যতা আমার আছে -- তবে আমার জীবনের গতিপথ এমনটা হত না। কিন্তু তাই তো হল।

এই গল্প সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এতোটা কঠিন হবে ভাবিনি। আমাকে আইটিউনসে গিয়ে নাচের দলের সেই গানটা আবার শুনতে হয়ে্ছে। শুনতে গিয়ে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। ড্রিল টিমে জায়গা পাইনি ব'লে নয়, আমি কাঁদছিলাম সেই মেয়েটির জন্য যে কেন কী হচ্ছে তার কিছুই ঠাহর করতে পারেনি। আমার অরক্ষিত অবস্থায় আমাকে সুরক্ষা দেবার ব্যাপারে খুব অদক্ষ যে বাবামা, তাদের জন্য কাঁদছিলাম আমি। যাদের জানা ছিল না কী ভাবে ওই নৈঃশব্দ্য ভেঙে কথা কইতে হয়, সান্ত্বনা দিতে হয়, অথবা নিদেনপক্ষে আমার বহিরাগত হয়ে যাবার গল্পে বাধা দিতে হয়। এই  কারণে আমরা পরিণত জীবনে এসেও নিজের আপন আস্তানা খুঁজে বেড়াই, খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করতে থাকি। সৌভাগ্যের কথা, আমার বাবামা কখনো মনে করেননি সন্তান বাড়ি ছেড়ে যাবার পর তাদের বাবা-মা হবার দায়িত্ব ফুরিয়ে যাবে। সাহসিকতা কী, অরক্ষিত থাকা কাকে বলে, আপন হওয়া মানে কী, এ সব আমরা পরে একসঙ্গে শিখেছি। সে সব ছোটোখাটো অলৌকিক ঘটনা বলা যায়।

এমনকি কষ্টের চালচিত্রে -- দারিদ্র্য, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যেও -- পরিবারের কাছে আপন হতে না পারার ব্যথা সবচেয়ে বেশি। তার কারণ এই একাত্মতার অভাব আমাদের বুক ভেঙে দেয়, আমাদের আত্মাকে চুরমার করে দেয়, আমাদের আত্মমর্যাদাকে ধ্বংস করে। আমার ক্ষেত্রে এর সবকিছুই হয়েছিল। এই রকম হলে কেবলমাত্র তিনটি ফলাফল আছে, আমি আমার জীবনে আর কাজে এর সাক্ষ্য দিতে পারি:

১) ব্যথা হয় চিরন্তন। সেই ব্যথাকে অবশ করে অথবা অন্য মানুষের মধ্যে সঞ্চালিত করে আপনি উপশম খোঁজেন।

২) ব্যথা আছে এ কথা আপনি অস্বীকার করেন। এই অস্বীকৃতির ফল, সেই ব্যথা আপনার শিশুর মধ্যে সঞ্চালিত হয়।

৩) আপনি এই ব্যথাকে স্বীকার করে নেন, একে আপন করে নেন সাহসিকতার ভিতর দিয়ে। নিজের জন্য সমবেদনা আর করুণা অনুভব করেন, নিজের ভেতরে, অন্যের ভেতরে। এর ফলে দুনিয়ায় ব্যথাকে চিনে নেবার এক অসামান্য ক্ষমতা তৈরি হয় আপনার মধ্যে।

আমি এ তালিকার প্রথম দুই দফা নিশ্চয়ই চেষ্টা করেছি। এক পরম কৃপার ফলে আমি তৃতীয় দফায় এসে পৌঁছই।

এই ঘটনার পরে আমার বাড়ীর বিবাদ আরো তীব্র হয়ে উঠল। সেই সব বিবাদে কোনো কিছুই উহ্য থাকত না। আমার বাবা-মার অন্য ভাবে বিবা্দের দক্ষতা জানা ছিল না। আমি নিজেকে বোঝালাম দুনিয়ায় শুধু আমার মা বাবাই তাদের বিবাহিত সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য সংগ্রাম করছেন। আমার খুব লজ্জা হল। আমার ভাই আর বোনের বন্ধুরা আমার বাবামাকে বলতেন, "মিস্টার এবং মিসেস  বি। শুনতে লাগত বেশ -- মনে হত কত দারুণ মানুষ তাঁরা। কিন্তু আমি তো জানি তাঁরা ঝগড়া করেন, আর এও জানি এইসব বন্ধুদের বাবামা টিভিতে দেখা বাবামার মত অসম্ভব সুখী মানুষ। সুতরাং গোপনীয়তার লজ্জা আমার মধ্যে স্তূপ হতে শুরু করে।

দৃষ্টিকোণ আসলেই অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। আমার আশেপাশে যা হচ্ছে তাকে স্বাভাবিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রেখে দেখার মতো অভিজ্ঞতা আমার তখন নেই। আমার মাবাবা তখন কোনো রকম বিধ্বংসী কিছু না ঘটিয়ে কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাই আমাদের কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে এমন কথা তাদের মাথায় আসেনি। আমার হাইস্কুল তখন বিশ্বরেকর্ড তৈরি করে খবরের কাগজে এসেছে। ছাত্রদের সব চেয়ে বেশি আত্মহত্যার রেকর্ড নিয়ে। কিন্তু সে খবর ছাপিয়ে আমার ধারণা, সেই শহরে, এমন কি সারা পৃথিবীতে আমার মতো গাড্ডায় কেউ পড়েনি। অনেক পরে, দুনিয়ার মানুষ যখন নিজ নিজ সংগ্রামের কথা বলতে শুরু করে, তখন আমি যে সব বাবামাকে খুব সুখী বলে জানতাম, তাদের অনেকে বিবাহবিচ্ছেদে আলাদা হয়ে গেছেন, কেউ কেউ মানসিক চাপে অসুস্থ, আর কেউ কেউ, সৌভাগ্যক্রমে সেরে উঠছেন।

কখনো কখনো নৈঃশব্দ্য  নিজের মতো ফিসফিস করে এক গল্প  বলতে থাকে শিশুদের কানে। শিশুমনে তৈরি সে গল্প। সে-ই সব থেকে বিপদের কথা। সে গল্পে তারা নিজেদের ভালবাসার অযোগ্য ব'লে ভাবে। নিজেদের মূল্যহীন হিসেবে তুলে ধরে। আমার কাছে আমার নিজের কথকতা এমনটাই ছিল। তাই ছুটির সময় আমি হাই কিক অনুশীলন না করে আমার চেয়ারের তলায় নেশার বস্তু লুকিয়ে রাখি, বুনো প্রকৃতির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দৌড়ই। আমার ধরণের মানুষ খুঁজি। আমি আর কখনো কোনও দলের অন্তর্ভুক্ত হবার চেষ্টাও করিনি। বরং খাপ খাওয়াবার অনুশীলনে আমি চোস্ত হয়ে উঠি। এমন কিছু করতে থাকি যেন কিছুর অংশ ব'লে আমি নিজেকে চিহ্নিত করতে পারি।

আমার বাবামার চলমান ক্রমশ আরো বিষণ্ণ-হতে-থাকা বিবাদের মধ্যে আমার দুই বোন আর এক ভাই ত্রাণের জন্য আমার ঘরে  এসে জুটলে আমি তাদের জন্য সব কিছু কী ভাবে 'আরেকটু ভালো' হতে পারে, সে চেষ্টা করতে থাকি। বীরবিক্রমের সঙ্গে আমি বিবাদ কেন হয়েছে বোঝার চেষ্টা করি। আমার পরিবার আর আমার ভাইবোনের জন্য আমি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। যখন তা কাজে দিত আমার নিজেকে হিরো বলে মনে হত। এখন লিখতে গিয়ে বুঝতে পারছি এই অবস্থায় আমি গবেষণা আর উপাত্তকে অরক্ষিত অবস্থার থাকার চেয়ে বেশি মূল্য দিতে শিখছিলাম।

পিছনে ফিরে বুঝতে পারি আপন হতে না পারাই আমাকে মূলত এই জীবিকা দিয়েছে। প্রথম শিশু হিসেবে, তারপর উঠতি জোয়ান হিসেবে, আপন হতে না পারাকে সামাল দিতে আমি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতাম, শিখতাম তাদের কাছ থেকে। মিলের নক্সা খুঁজতাম। খুঁজতাম সংযোগ। আমি জানতাম মানুষের আচরণের ধরণ চিনে সেইসব তাদের কাজ আর অনুভুতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে, পথ খুঁজে পাব। নক্সা অনুধাবনের দক্ষতাকে ব্যবহার করে বুঝতে চাইতাম, মানুষ কী চায়, কী চিন্তা করে, অথবা তারা কী করছে। আমি সঠিক কথাটা বলতে, সঠিকভাবে নিজেকে হাজির করতে শিখলাম। একজন বর্ণচোরার মতো নিজেকে মিলিয়ে নিতে শিখলাম পরিবেশের সঙ্গে। ফলে নিজের কাছে অজ্ঞাত আর নিঃসঙ্গ থেকে গেলাম আমি।

সময়ের সঙ্গে আমি অন্য মানুষকে যতটা ভাল চিনতে শিখি, ততটা ভালো তারা নিজেরাই নিজেদের চেনে না। সেই প্রক্রিয়ায় আমি নিজেকে হারাই। আমার বয়েস যখন একুশ, আমি কলেজে ভরতি হয়েছি, বেরিয়েও এসেছি, আমার বাবামার বিচ্ছেদ ঘটে গেছে, হিচ হাইক করে ছয় মাস ইউরোপে ঘুরে এসেছি আমি। হালকা ধরণের সব নেশা করা থেকে শুরু করে আত্মবিধ্বংসী সব ধরণের বোকা বোকা কাজ করেছি । কিন্তু ক্লান্তি আসছিল। আমি ধোঁয়ার ওপর বেঁচে আছি। এই ধরণের পলায়নকে একজন খুব মোক্ষমভাবে ধরেছেন: 'জীবনের মানের চেয়ে দ্রুত ক্ষয়ে আসা শরীর।'

১৯৮৭ সালে আমার স্টিভের সঙ্গে দেখা। কেন জানি তার সঙ্গে আমি নিজেকে আপন করে পাই। এমনটা আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী এলেনরের সংগে কেবলমাত্র হয়েছে। স্টিভ আমাকে দেখতে পেত। আমার আত্ম-বিধ্বংসী দিনগুলির শেষ ডগা সে ধরতে পেয়েছিল। তারপরও সে আমাকে দেখতে পেত। আমাকে পছন্দ করত। তার পরিবারেও এমন এক বেদনাময় কাহিনী ছিল। তাই সে আমার ব্যথা চিনতে পেরেছিল। জীবনে প্রথমবারের মতো আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললাম। কুঁড়ির মতো যেন ফেটে পড়লাম আমরা । কখনো দশ ঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বলতাম। আমরা আমাদের দেখা প্রত্যেকটি বিবাদ, কলহ নিয়ে কথা বলেছি। যে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে আমাদের নিয়ত লড়াই, সেই নিঃসঙ্গতা নিয়ে,  এবং কোথাও আপন হতে না পারার অসহনীয় বেদনা নিয়ে।

যা বন্ধুতা হিসবে দেখা দেয়, তা-ই উত্তাল প্রেম এবং ক্রমশ পূর্ণ ভালোবাসা হল। দেখতে পাবার ঘটনা যে কতো শক্তিশালী -- তা যেন কখনো কেউ ছোটো না করে। কেউ যখন সত্যি আমাদের দেখে আর ভালবাসে তখন নিজের বিরুদ্ধে পথ চলা ক্লান্তিকর। কখনো তার ভালোবাসা উপহার বলে মনে হত। কখনো তার এই সাহসিকতাই ক্রুদ্ধ করত আমাকে। কিন্তু যখন আমি আসল আমি-র টুকরো টুকরো ছবি দেখতে শুরু করলাম, আমার মন শোকে আর গভীর আকাঙ্ক্ষায় ভ'রে উঠল। যে মেয়েটি কোথাও আপন হতে পারেনি, তার জন্য শোক, তাকে জানবার গভীর আকাঙ্ক্ষা আমাকে আকুল করে তোলে। তার কী ভালো লাগে, কী সে বিশ্বাস করে, কোথায় সে যেতে চায়, সে সব জানার ব্যাকুলতা। স্টিভ আমার এই আত্মজিজ্ঞাসা ভয় পায়নি। ভালবেসেছিল। সমর্থন করেছিল।

সুতরাং ডক্টর মায়া এঞ্জেলু, কোথাও আপন না হতে পারা কোনো ভাবেই ভালো কিছু হতে পারে না। তখনো আমি বুঝতে পারছি না, তাঁর সেই উদ্ধৃতির মর্ম।

পরিচয়ের সাত বছর পরে স্টিভ আর আমি বিয়ে করি। সে মেডিকাল স্কুল থেকে রেসিডেন্সি করতে যায়। আমি স্নাতক থেকে স্নাতোকোত্তরে উত্তীর্ণ হই। ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স শেষ করে আমি ঠিক করি আমি সিগারেট আর মদ জন্মের মতো ছেড়ে দেব।

আমাদের বিয়ের প্রথম বছরগুলি সংগ্রামের ছিল। রেসিডেন্সি আর গ্র্যাজুয়েট স্কুলের চাপ, নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা। আমার মনে আছে একজন কলেজ থেরাপিস্টকে বলেছিলাম, এই বিয়ে হয়ত টিকবে না। তিনি কী উত্তর দিলেন জানেন? "মনে হয় না। তুমি নিজেকে যতটা পছন্দ করো তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে সে।'

আমার নিপুণ ভাবে খাপ খেয়ে যাওয়া একজন মানুষ থেকে নিজের আপন হয়ে ওঠা -- শুরু হয় বিশের কোঠায় আর শেষ হয় চল্লিশের কোঠায়। ত্রিশের কোঠায় আমি এক আত্মবিধ্বংসী কাজ আরেক বিধ্বংসী কাজের বিনিময়ে পাল্টাপাল্টি করে নিই। নেশা গেল, এল নিখুঁত হবার শুচিবাই। আমি তখনো একজন বহিরাগত, কিন্তু তালিকায় নিজের নম্বর না দেখলে আমি আর আগের মতো মৌন লজ্জায় ছোটো হয়ে যাই না। বরং নিজের ভয় আর বেদনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি। আমার কাছে কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ সে সব প্রশ্ন করি নিজেকে। তালাবন্ধ ধারণায় বন্দী থাকা কী আমার পোষাবে মনে হয়? না। আমাকে যখন বলা হল কোয়ালিটেটিভ গবেষণা করা হবে না, তখনো আমি সেটাই করি। আমাকে বলা হয় 'লজ্জা' আমার গবেষণার বিষয় হতে পারে না, আমি তা-ই বেছে নিই। যখন লোকে জানায় আমি একজন অধ্যাপক হয়ে জনগণের কাছে পৌঁছনোর মতো বই লিখতে পারব না, আমি সেই বই লেখাতেই হাত দিই।

এমন যেন মনে করা না হয়, যে আমি খাপে খাপে মিলে যাবার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে -- স্বতন্ত্র, প্রতিবাদী, অবাধ্য হওয়ার পথে চলে গেছি। ওই রকম বিপরীতগামিতা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আমি তখনো গভীরভাবে আপন হতে চাই  এবং জীবিকার দিক থেকে মূলস্রোতের বাইরে থাকা আমাকে চিরন্তন দুশ্চিন্তা আর অভাববোধে পীড়িত করে। একে এক আদর্শ অবস্থা বলা যাবে না, কিন্তু আমি তখন অনেকটা পথ হেঁটে জেনে গেছি যে স্রোতের টানে হুবহু মিলে গেলে, আমার কাছে ঠিক যা চাওয়া হয়, সেটুকুর বাইরে কিছু না করতে পারলে, আমার অনেক ক্ষতি হবে -- হয়ত আমার স্বাস্থ্য, বিয়ে, অথবা আমার নেশা-থেকে-দূরে-থাকার-প্রতিজ্ঞা টিকবে না। এই তিনটে জিনিস না টিকলে আমার চলবে না ব'লে আমি মূলস্রোতের বাইরেই থেকে যাই। অথচ সহযাত্রী চাইছিলাম আমি।

তারপর, ২০১৩ সালে, কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ওপ্রা উইনফ্রি তাঁর সুপার সোউল সানডে ব'লে অতি প্রিয় এবং বিপুলখ্যাত টিভি অনুষ্ঠানে আমাকে সাক্ষাৎকার নিতে ডাকেন।

শো এর আগে শো-এর একজন প্রযোজক এবং আমার ম্যানেজার মারডকের সঙ্গে আমি বাইরে খেতে গেছি। খাবার পর মারডক শুধায়, 'ব্রেনে, তুমি এখন কোথায়?'

আমি তাকে বেশ চোস্ত এবং চালাক শুনতে একটা উত্তর দিই, 'মিশিগান আর শিকাগোর কোনা কেটে অবস্থান করছি।' কিন্তু বলতে গিয়ে মনে হয়, আমি কিছু একটা ভুল করছি। নিজেকে অরক্ষিত লাগছে আমার। মারডক আমাকে বোঝায় কী ভাবে আমি খাওয়ার সময় 'হাজির' ছিলাম না। ভদ্র ছিলাম যদিও। আমি মারডকের দিকে তাকিয়ে বললাম, 'আমি ভয় পেলে যা করি, তাই করছি। আমি আমার জীবনের ওপরে হাওয়ায় ভেসে উঠছি, নিজেকে বাইরে থেকে দেখছি পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়, অবিকল বাঁচতে পারছি না।'

মারডক মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। 'জানি। কিন্তু তোমার সেটা বন্ধ করে জীবনেই ফের ফিরে আসতে হবে। যা ঘটতে চলেছে তা বারবার হবার নয়। একে হেলায় হারানো যাবে না যে। পর্যবেক্ষণ নয়। বর্তমানে উপস্থিত থাকো, ব্রেনে।'

পরের দিন সকালে আমি যখন শো-তে যাবার জন্য প্রস্তুত হই, আমার কন্যা আমাকে এস এম এস করে। ওর ইস্কুলের এক ভ্রমণের ব্যাপারে অনুমোদন জানিয়ে একটা স্লিপে আমার সই দেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চায়। তার এস এম এস-এর জবাব দিয়ে আমি বিছানার এক প্রান্তে বসে বহু কষ্টে কান্না চাপার চেষ্টা করতে থাকি। আমার নিজের একটা অনুমোদনের স্লিপ লাগবে -- যেন এতটা গম্ভীর আর আর্ত না হই । সেই মুহূর্তে মাথায় এক খেয়াল চাপে। আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিই কেউ আমাকে লক্ষ করছে কিনা। করছে না জেনে একটা স্লিপে লিখি, 'তোমাকে উল্লসিত, মজাদার আর অদ্ভুত হবার অনুমোদন দেওয়া হল।'

এমন এক শ' খানা স্লিপ এরপর আমি নিজের জন্য লিখেছি। এখনো লিখি। আমাকে যে তার পাঁচটা মিনিট দিতে রাজি, তাকে আমি এই অভিপ্রায়-ঠিক-করার পদ্ধতি শিখাই। খাসা কাজ করে। শিশুদের চিড়িয়াখানায় যাবার অনুমোদন দিলে তাদের অবশ্য ঠিকই বাসে উঠতে হয়। সেদিন, আমিও বাসে উঠেছিলাম।

তখন আমি বুঝতে না পারলেও এখন জানি ওই অনুমোদন-স্লিপগুলির ভিতর দিয়ে আমি আর কারুর নয়, নিজের আপন হবার চেষ্টা করছিলাম।

ওপ্রা এবং আমার ক্যামেরার সামনে প্রথম আবেগঘন সাক্ষাতের কিছু মিনিটের মধ্যেই আমরা হাসছি, ঠাট্টা করছি। তাকে যেমনটা ভেবেছিলাম দেখা গেল তিনি ঠিক তেমন। তীব্র, সহৃদয়। অমায়িক, সহিষ্ণু। এক ঘন্টা চোখের পলকে কেটে গেল। আমাদের সময় যখন শেষ, ওপ্রা আমার দিকে ফিরে বললেন, 'আমাদের আরেক ঘণ্টা করা দরকার -- আরেক এপিসোড'। আমি চারদিকে তাকাই অস্বস্তি নিয়ে।

'সত্যি?'

ওপ্রা মিটমিট করে হাসছেন। 'সত্যি। অনেক কথা বলা বাকি থেকে গেল যে।'

আমি অন্ধকারে কন্ট্রোল রুম ব'লে যা মনে হচ্ছিল সেদিক দেখিয়ে বললাম, 'ওদের কি জিজ্ঞেস ক'রে নিতে হবে?'

ওপ্রা আবার মিটমিট হাসছেন। 'কাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে ব'লে মনে হয়?'

তার কথায় অহংকার ছিল না, আমার প্রশ্ন তার অদ্ভুত শোনাল।

'ওঃ তাই তো বটে। দুঃখিত। তাহলে, হ্যাঁ! অবশ্যই! আমার ভীষণ ভালো লাগবে। কিন্তু পোশাক যে পাল্টাতে হবে! ইশ! আমি মোটে এক সেট জামা নিয়ে এসেছি।'

'বুট আর জিন্স ঠিক আছে। তোমাকে একটা টপ দিচ্ছি, দাঁড়াও।'

তিনি ভিতরে পোশাক পাল্টাতে যাবার সময় দুই কদম হেঁটে আবার ফিরে তাকিয়ে বলেন, 'মায়া এঞ্জেলু এসেছেন। কথা বলবে?'

হঠাৎ সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি যেন এক সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়ানো। সময় গড়িয়ে মন্থর হচ্ছে। এত কিছু এক দিনে! আমি নিশ্চয়ই মরে গেছি।

'ব্রেনে? আছো? ডক্টর মায়ার সঙ্গে দেখা করতে চাও কি?' আমি ভাবছি হয়ত খাড়া পাহাড় দিয়ে এবার আমাকে ঠেলে ফেলা হচ্ছে, এমন সময় ওপ্রা আবার বলেন, 'চাও?'

আমি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলি, 'হ্যাঁ! নিশ্চয়ই! অবশ্যই চাই!'

ওপ্রা আমার হাত ধরে আরেকটা গ্রিন রুমে আমাকে নিয়ে আসেন যেখানে আমি পরের এপিসোডের জন্য তৈরি হই। আমরা ভিতরে যাই; দেখি এক টি ভি স্ক্রীনের সামনে মায়া বসে আছেন। সেই স্ক্রীনে দুটো শূন্য চেয়ার দেখা যাচ্ছে। ঐ চেয়ারে আমি আর ওপ্রা এতক্ষণ বসে কথা বলেছি।

মায়া এঞ্জেলু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কেমন আছেন ডক্টর ব্রাউন? আমি এতক্ষণ আপনাদের কথা শুনছিলাম।'

আমি তাঁর দিকে এগিয়ে তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে বলি, 'আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া কী যে সৌভাগ্যের ঘটনা! আপনি আমার কাছে অনেক কিছু। আমার জীবনের একটা বড়ো অংশ আপনি।'

তিনি আমার হাত ধরে ছিলেন; এবার আরেক হাত আমার সেই হাতের ওপর রাখলেন। 'আপনি খুব জরুরি কাজ করছেন। থামবেন না। কাউকে থামাতে দেবেন না।'

আমি তখন তাঁকে বলি, কখনো কখনো পড়ানোর সময় ক্লাসে সব আলো বন্ধ করে দিয়ে আমি তাঁর রেকর্ড করা 'আমাদের মাতামহ' কবিতাটা ছাত্রদের শোনাই। কখনো সেই লাইন দুইবার করে বাজাই, '...আমাকে কিছু নাড়াতে পারবে না।'

তিনি আমার হাত আরো শক্ত ক'রে ধরেন, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর, ধীর কন্ঠে বলতে থাকেন, 'নদীর ধারে বেড়ে ওঠা এক গাছের মতো, আমাকে কিছু নাড়াতে পারবে না।' তারপর আমার হাতে উষ্ণ চাপ দিয়ে বলেন, 'নাড়াতে দেবেন না, ব্রেনে।'

যেন তিনি সে মুহূর্তে আমার জীবনে যত সাহস লাগবে সবটুকে সঁপে দিচ্ছিলেন। এক বিশেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কদাচিৎ জানা যায়, সে মুহূর্ত আমাদের নির্ধারণ করে দেবে। কিন্তু আমি জানতে পেরেছিলাম তখন। সারা জীবন যে খাপ খাওয়াতে চেয়েছে হঠাৎ মায়া এঞ্জেলু তাকেই গান শোনালে, 'নাড়াতে দেবেন না', বললে সে কী করে? কী আর করবে, তার পা দুটো শিকড় হয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে যায়। সে নুয়ে পড়ে, প্রসারিত হয়, বাড়ে, কিন্তু সত্তা থেকে এক চুল না সরার অঙ্গীকার নেয়। অথবা পারতপক্ষে চেষ্টা করে।

সেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য দিনটির ছয় মাস পর আমি দেখি আমি শিকাগোর আরেকটি গ্রিন রুমে বসে আছি। এবার আমি নেতৃত্বের ওপর পৃথিবীর একটি বৃহত্তম সম্মেলনে এসেছি। যারা অনুষ্ঠানের সংগঠক, তাঁরা পইপই করে বলে দিয়েছেন ধোপদুরস্ত কালো পোশাকে হাজির হতে হবে। আমি আমার কালো স্ল্যাক্স আর পাম্প শু-এর দিকে তাকাই। নিজেকে ছদ্মবেশি বলে মনে হতে থাকে।

আমি আরেকজন বক্তার পাশে বসে আছি (তিনি আমার বন্ধু হয়ে যান), জিজ্ঞেস করেন আমার কেমন ঠেকছে। আমি স্বীকার করি আমার বেশ খাপছাড়া লাগছে, মনে হচ্ছে আমি অভিনয় করতে এসেছি। তিনি বলেন যে আমায় দেখতে 'বেশ ভালো' লাগছে, কিন্তু তাঁর মুখে লেখা ছিল এক না-শোনা বার্তা 'কিন্তু উপায় কী, বলুন?'

আমি হঠাৎ উঠে দাঁড়াই; যে দেয়ালে আমাদের সুটকেসগুলো পরিপাটি সাজানো, সেখান থেকে আমার সুটকেস ওঠাই, এবং ওয়াশরুমে গিয়ে পোশাক পাল্টে আসি। আমার পরনে নেভি শার্ট, কালো জিন্স, ক্লগ জুতো -- আমার সহজাত পোশাক। মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, 'অসাধারণ। সাহস আছে বটে আপনার!'

জানি না কথাটা তিনি সত্যি ভেবে বলেন কিনা, কিন্তু আমি হেসে জানাই, 'আসলে তা নয়। এটার প্রয়োজন ছিল। ঐ মঞ্চে আমি 'সত্য হবার সাহস' নিয়ে কিছুতেই কথা বলতে পারব না, যদি না নিজে চর্চা করি। শারীরিক ভাবেই পারব না। এখানে আমি তাদের ব্যবসায়ী সত্তার সঙ্গে আলাপ করতে আসিনি। এসেছি আমার হৃদয় ওদের হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলুক এই আশায়।' এ ঘটনা ছিল নিজের কাছে আপন হবার আরেক ধাপ।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার ব্যবসাবাণিজ্যের জগতের সঙ্গে টক্কর খাই। একটা নোট পড়তে পড়তে দেখি এক সংগঠক লিখেছেন, 'আমরা শুনলাম আপনি গত বছর এক সম্মেলনে কথা বলেছেন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি আপনি আমাদের পরিচালকদের  সঙ্গেও কথা বলবেন! আমরা আপনাকে বলতে শুনেছি, মানুষের গভীর মূল্যবোধগুলি জানা দরকার -- সে কথা আমাদের ভালো লেগেছে। আপনি অবশ্য বলছিলেন আপনার চালিকা-মূল্যবোধের দুটোর একটা নাকি বিশ্বাস। কিন্তু যেহেতু আমরা এই মুহূর্তে ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে কথা বলছি, সুতরাং আপনাকে অনুরোধ করি বিশ্বাস নিয়ে কিছু না বলতে। আপনার প্রধান মূল্যবোধের আরেকটি, আপনি জানিয়েছেন -- সাহসিকতা। আপনি সেটাতেই আপনার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখুন, দয়া করে।'

আমি বুঝতে পারছি আমার বুকের খাঁচায় টান পড়ছে, আমার চোখমুখ লাল হয়ে উঠছে। গত বছর ঠিক এমন এক ঘটনা ঘটে। যদিও ঠিক এর উলটো মেরুর ঘটনা বলা চলে তাকে। একটি অনুষ্ঠানের সংগঠক আমাকে বলেছিলেন, ' আমার সোজাসাপটা ঘরোয়া কথা বলার ধরণ' তাঁর পছন্দ হয়, কিন্তু আমি যেন কথা বলার সময় মুখ খারাপ না করি, কারণ তা করলে 'বিশ্বাসী শ্রোতা'দের আমি হারাব; তারা হয়ত আমাকে ক্ষমা করে দেবে -- তবে  চোট পাবে ঠিকই।

বাজে কথা। আমি এ পারব না। তার চেয়ে কিছু না বলাই ভালো। দৌড়ঝাঁপের এইখানেই ইতি।

সারা জীবন আমার মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে কেটেছে। তাদের সব চেয়ে কঠিন মুহূর্তের কথা। সবচেয়ে বেদনাময় সময়ের কথা। পনেরো বছর ধরে এই কঠিন কাজ করার পর আমি আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলতে পারি বেদনা আর সাহসের প্রতিটি গল্পেই দুটি সর্বজনীন বিষয় আছে --  প্রার্থনা আর মুখখারাপ। দুটো কখনো এক সঙ্গে ঘটে।

আমি আমার স্নিকারস পরে আর ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাই। বাড়ির সীমানা  ছাড়িয়ে যেতেই আমি এই চিঠি এবং এই ধরণের সব চিঠির জবাব কী দেব, বুঝে উঠতে পারি: আপনি যদি ভেবে থাকেন মানুষের সত্যিকার অভিজ্ঞতার পুঁজ আর পাঁক আমি পরিষ্কার করে উপস্থাপন করব, অথবা ঘষে মেজে নেব, আপনি ভুল করছেন। আমি খুব একটা মুখখারাপ নিশ্চয়ই করব না, কিন্তু দুএকটা আটপৌরে মুখখিস্তি যদি  আপনারা সহ্য করতে না পারেন,  এমন ভাব দেখান যে মুখখারাপ করার অর্থ আমার বিশ্বাস টিশ্বাস নেই, তাহলে এটা আমার জায়গা নয় । বক্তার যখন অভাব নেই,  আপনারা তাদের নিয়ে আসুন যারা ধোপদুরস্ত, পরিপাটি, অথবা যারা স্রেফ মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। আমি সে বান্দা নই । ব্যাস।

আমাকে নাড়ানো যাবে না!

স্টিভ বাড়ি ফিরলে আমার এই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে ওর পাশে বসে ওর কাঁধে মাথা রাখলাম। 'বড্ড কঠিন মনে হয়,' আমি বলি, 'আমি কোথাও খাপ খাওয়াতে পারি না। কোথাও আপন হতে পারি না। কোথাও না। যেখানে যাই, আমি একজন বহিরাগত যে নিয়ম ভাঙে, যে এমন কথা বলে যা আর কেউ বলে না। আমার কোনো সহযাত্রী নেই। এমন ভাবেই সারাটা জীবন কেটে গেল।'

স্টিভ আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল না। বরং মাথা নাড়িয়ে জানাল, আমি আসলে কোনো বিশেষ দলে পড়ি না। এও বলল, আমি স্টিভ, এলেন আর চারলির আপনজন, এবং ওদের সামনে আমি যত খুশি প্রার্থনা আর মুখখারাপ করতে পারি।

আমি একটু ম্লান হাসি, কিন্তু চোখ ভিজে যেতে থাকে। 'সারা জীবন আমি বাইরেই থেকে গেলাম,' বলি তাঁকে, 'ব্যাপারটা এমন কঠিন। কখনো কখনো আমাদের বাড়ি সে একমাত্র জায়গা যেখানে আমার অসম্ভব একা লাগে না।  আমি হয়ত যে পথে আছি সে পথটা ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারিনি -- এখানে তো আর কেউ নেই। কেউ বলছে না, 'তোমার আগে এরকম একজন আছে -- যিনি একাধারে অধ্যাপক, গবেষক, কথক, নেতৃত্বের সংগঠক, বিশ্বাসী, মুখখারাপ করা লোক।

স্টিভ আমার হাত ধরে বলে, 'বুঝতে পারি এটা কতোটা কঠিন। তোমার নিশ্চয়ই একা লাগে। তুমি কিছুটা অদ্ভুতও বটে -- অনেক দিক থেকে খুব আলাদা। কিন্তু ব্যাপার হল -- ওই বিশাল নেতৃত্বের সম্মেলনে বিশ জন বক্তার মধ্যে তুমি ছিলে শ্রোতাদের বিচারে সেরা বক্তা। সাদামাঠা ঘরোয়া পোশাকেই এমন হয়েছিল। যদি তা-ই হয়, ওই মঞ্চ তো তোমারই। তুমি যেখানেই  নিজের সত্তাকে মেলে ধরবে, নিজের কাজ নিয়ে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারবে, সেটাই তোমার নিজের জায়গা।'

ঠিক সে মুহূর্তে ব্যাপারটা ঘটে।

আমি মায়া এঞ্জেলুর কথাটার গভীর ও ব্যবহারিক তাৎপর্য বুঝতে পারি। আমি স্টিভকে চুমু খেয়ে, দৌড়ে আমার পড়ার ঘরে ঢুকি, ল্যাপটপে বসি আর গুগলে  মায়ার সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতি খুঁজি। ল্যাপটপটা স্টিভের কাছে নিয়ে গিয়ে ওকে পড়ে শোনাই:

"আমরা কেবল তখন মুক্ত যখন আমরা অনুধাবন করি, কোনো জায়গা আমাদের নিজের নয় -- আবার সব জায়গা আমাদের নিজের। এর জন্য চড়া দাম দিতে হয়। পুরস্কারও অনবদ্য।"

আরে ঠিক সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে আগাগোড়া যেভাবে দেখে এসেছি, ছোট একটা নিঃসঙ্গ, ম্লান মেয়ে যে ইস্কুলের তালিকায় নিজের নাম খোঁজে কোনো জায়গার সঙ্গে একাত্ম হবার জন্য, সেই ছবিটা আমূল পাল্টে যায়। আমার কাজে আমি সফল হয়েছি। আমার একজন দারুণ জীবনসঙ্গী আছে, অসাধারণ দুটো ছেলেমেয়ে আছে। কিন্তু সে মুহূর্তে আগে আমি আমার নিজের ভুবনের কাছে, আমার জন্মসূত্রে পাওয়া পরিবারের সঙ্গে যেন আপন হতে পারিনি।

স্টিভ টের পায় কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছে। 'এর জন্য চড়া দাম দিতে হয়, ঠিক। কিন্তু পুরস্কার হল তোমার কাজ জগতর কাছে খোলামেলা পৌঁছতে পারছে। যারা তাঁদের কাহিনী খুলে বলেছে তোমায়, তাঁদের সঙ্গে সৎ থেকে।'

আমি তাঁকে জিজ্ঞস করি একা দাঁড়িয়েও সত্যিকার অর্থে সব জায়গাকে আপন করে পাওয়ার এই অদ্ভুত দ্বৈততা সে বুঝতে পারছে কিনা। সে বলে, 'হ্যাঁ। কখনো কখনো আমারও এমন হয়। এর মধ্যে একটা আপাতবিরোধী ব্যাপার আছে। নিজেকে একা লাগে, আবার একই সঙ্গে শক্তি পাওয়া যায়। অনেক সময় শিশুডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও আমি ছোটদের এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিতে বারণ করি। এতে শিশুদের মাবাবারা বিরূপ হন। আমাকে বলেন, 'শিশুডাক্তার সকলে এন্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। এ আবার কেমন চিকিৎসা! আমরা অন্য কারুর কাছে যাই।' ডাক্তার হয়ে এ কথা শোনা সহজ নয়, কিন্তু আমি সবসময় মনে করি: 'আমি শিশুর জন্য যা ভালো বলে বিশ্বাস করি সেটাই বলেছি। ব্যস।'

আমার চিন্তায় যেন আরো একজোড়া চাকা যোগ হয়। আমি বলি, আমি যদিও একা দাঁড়ানোকে এক অরক্ষিত, সাহসী অবস্থান হিসেবে চিনতে পারছি, তারপরও আমি জানি -- একটা যোগসূত্র একটা একাত্মতাবোধের জন্য আমাদের মধ্যে আকুলতা থেকে যায়।  আসলে আমি নিজস্ব এক 'বাহিনী' চাই। "সেই 'বাহিনী' তো তোমার আছে ," স্টিভ বলে, 'যদিও সে এক ছোটো বাহিনী। আর তোমার বাহিনীতে সকলেই এক ভাবে চিন্তা অথবা কাজ করবে এমন তো নয়। সত্যি বলতে কি, সেরকম বাহিনী আমাদের সকলের আছে।"  আমি টের পাই ওর কথা ঠিক, কিন্তু তারপরও ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।

অবশেষে আমি উঠে দাঁড়াই। স্টিভকে জানাই আমাকে এই সব কিছুর মানে বের করতে হলে মায়া এঞ্জেলুর উদ্ধৃতি আর আমার সংগ্রহের সমস্ত উপাত্তের কাছে ফিরে যেতে হবে। ওর উত্তরে স্টিভ যা বলে তা মনে করলে এখনো হাসি পায়। 'ও, হ্যাঁ। এবার কী হবে আমার জানতে বাকি নেই। তোমার গবেষণার ওই খরগোশের গর্তের মধ্যে খাবার পৌঁছে দিতে হবে তো? দেব। গতবার সেই গর্ত থেকে বেরোতে তোমার দুই বছর লেগেছিল।'

আমি বিল ময়ার আর মায়া এঞ্জেলুর সেই সাক্ষাৎকার খুঁজে বের করে ফের খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি। শেষের অংশ এতো দিনে খেয়াল করে পড়লাম:

ময়ারস: আপনি কোথাও আপন বোধ করেন?
মায়া: এখনো করিনি।
ময়ারস: এমন কেউ আছে আপনি যার আপন?
মায়া: তা আছে বৈকি। রোজ একটু একটু করে সেই মানুষের সঙ্গে আমার আপন হওয়া কেবল বেড়েই চলেছে। সত্যি বলতে কী, আমি নিজেরই পরম আপন। এতে এক ধরণের গর্ব আছে, বুঝলেন? আমি মায়ার দিকে কেমন করে তাকাই সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট নজর দিতে হয়। ওর সাহস আর রসবোধ আমার দিব্যি লাগে। আমি যখন এমন কিছু করি যা আমাকে অখুশি করে, তখন,... তখন সে ব্যাপারে আমাকে সচেতন হতে হয়।

আমি এই আলোচনা পড়া শেষ করে ভাবি, মায়া মায়ার আপন। আমি আমার আপন। এবার বুঝলাম। এখনো পুরোটা বুঝিনি, কিন্তু বুঝতে শুরু করেছি।

এবার গবেষণার গর্ত থেকে বেরোতে লাগে চার বছর। আমি পুরোনো উপাত্তে ফিরে যাই। নতুন উপাত্ত জমাই। আর ক্রমশ 'আপন হবার তত্ত্ব' জমাট বাঁধতে শুরু করে।

টের পাই আপন হওয়া কাকে বলে বুঝতে অনেক বাকি থেকে গেছে।









লেবেলসমূহ: ,

মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

মেয়েদের কালো প্রোফাইল পিক

আজ ফেসবুকে কালো প্রোফাইল পিক দিচ্ছে কিছু প্রিয় মেয়ে বন্ধু। আমি তাদের ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি। এই সমাজে মেয়েরা যদি না থাকত, তাহলে কী হত? এই প্রশ্ন থেকে, মেয়েদের 'লক্ষ' করার জন্য এই প্রস্তাব। আমার একে যুক্তিসংগত মনে হল না। কেন, বলি। মেয়েদের আসলে খুব ভালো করে লক্ষ করে সকলে। একটু বেশিই করে। তবে, পুরোটাই দর্শকের আসনে ব'সে। কখনো আমোদের দৃষ্টিতে, কখনো সমালোচক, কখনো বা বিচারকের চোখে, বাইরে থেকে। ভিতরের বা অন্তরের 'দর্শন' অন্য রকম। অন্তর সহকারে যদি দেখাতে চান, একটি নারীবর্জিত সমাজ কেমন হয়, তবে যারা 'অন্তর দিয়ে' দেখতে পান না, তেমন পুরুষের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করুন। এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে দুই তিন দিন। জিজ্ঞেস করুন, কেমন লাগল। এতে কিছু কাজ হলেও হতে পারে।

আমি শুনেছি, এক সমাজ-সংস্কারক একবার শ্রমিক নারীদের বলেছিলেন, শ্রমিক পুরুষদের মদের নেশা ছাড়ানর জন্য, এক সপ্তাহ হেঁসেলে কাজ করবেন না। রান্না করবেন না। সেই সব নেশাখোর পুরুষ সেই ভাবে নেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এই সমাজ সংস্কারক এবং এক্টিভিস্টের নাম শংকর গুহ নিয়োগী। তাঁর বই 'সংঘর্ষ ও নির্মাণ' পড়ে আমি ছোটবেলায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম।

এ ধরণের অর্থপূর্ণ কাজ আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। সংগ্রামের কঠিন আর বাস্তব রূপ চিনিয়ে দেয়।

নারীবর্জিত সমাজ যে অচল সেটা সব পুরুষ জানে। জানে বলেই একটু কম কম সে কথা বলতে চায়। কারণ সেটা বললে তার মূল্য চোকাতে হবে যে। নারীরা সে কথা জানেন, কিন্তু দয়াপরবশ হয়ে জানান দিতে চান না। একটা কালো প্রোফাইল ছবি দিয়ে কিন্তু এই সব জটিল বাস্তবতাকে স্বচ্ছ ভাবে আলোচনা করা হয় না। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যে আত্ম-সন্তোষ তৈরি হতে পারে, তা আসলে কাজে দেবে না।

যে কোনো ক্ষেত্রেই বাস্তব শাদা-কালোর চেয়ে বেশি জটিল। বেশি পরিশ্রম দাবী করে এর আলোচনা ও ট্রান্সফরমেশন। আমি সংক্ষিপ্ত, সহজ শাদাকালো বিচারকে ভ্রান্ত মনে করি।

১৭ এপ্রিল ২০১৮

শুক্রবার, এপ্রিল ১৩, ২০১৮

'চৈত্র সংক্রান্তি'

কালো জলে বেঙাচি দেখা যাচ্ছিল। জলের তলায় নয়, জলের ওপরে অম্লজানের অভাব। অন্যের গায়ের তাপ পাওয়া যাচ্ছে খুব কাছ থেকেই। তৈরি হচ্ছে যে বিশালাকায় পুত্তলিকা তার বর্ণাঢ্য রঙিন শোভা ঢেকে গেছে এই তাপে আর প্রশ্বাসের দূষণে। তবে তার মধ্যেই কারা যেন ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করেই আয়ত আনন্দে ছবি তুলছে। মুখোশের মুখেও ভীষণ খুশি। আসল কথা প্রেম। প্রেম আছে নিশ্চয়ই এই চত্বরে। প্রেমের আশ্বাসও আছে। তাই। ফুলের বৃতির মতন এক অদৃশ্য অভিন্ন হৃদয়ের চারপাশে যেন বসে আছে কিছু ছেলে মেয়ে। কী গান করছে তারা? দেশের সব চেয়ে জনবহুল উৎসবের মত এই উৎসবেও টাকা পয়সার বাহুল্য থাকা না থাকার সঙ্গে অসঙ্গতিহীন এই ফ্যাক্ট -- যে পাব্লিক টয়লেট একটাই এবং তার অবস্থা বিষণ্ণ। এই বিষণ্ণতা কি এতোই ছোট যে কোটি কোটি মানুষের বিষণ্ণতা গুণ করেও কিছু দাঁড়ায় না ব'লে কিছু পালটায় না? সারা রাত ধরে গান ছবি রঙ আর জীবনের কিছু স্মৃতি তৈরি হবে এখানে -- এই বাগানে এই সবুজ ভাপ ছাড়া মাঠে। হচ্ছে। শুধু, রাস্তায় পা দুটো জমা দিয়ে আসা গেছে। জীবনের একটা বেজরুরি অংশ চেপ্টে আছে এভাবেই অনেক ভারের নিচে। মঙ্গল হোক এই দারুণ সহিষ্ণুতার। এই অসংলগ্ন বহুমুখী আবেগের যা কলের মত ঝরে পড়ছে চেষ্টা না করতেই। আনন্দ পাবার জন্য মানুষ সব রঙের পাত্রে হাত ডুবিয়ে রেখেছে এখানে। কটোন ক্যান্ডি চেয়েও না পাওয়া শিশুর এক ফোঁটা আপসোস মুছিয়ে নিচ্ছে এক প্রস্থ আদুল-গা বাতাস।

১৩.৪.২০১৮

রবিবার, এপ্রিল ০৮, ২০১৮

বন্ধুত্বের নিদর্শন

ইস্কুল কলেজে পড়ার সময় বন্ধুত্বের সব চেয়ে বড়ো নিদর্শন ছিল, নিজের প্রিয় বই অন্যকে কিনে দেওয়া, অথবা তার চেয়ে বেশি যেটা প্রচলিত, পড়তে দেওয়া। নিজের সত্তাকে কারুর হাতে নিশ্চিন্তে সঁপে দেওয়ার মত। যে পেল সে জানে এর মূল্য -- তাই চুপ থাকে। যে দিল সে জানে নিশ্চিন্তে দেওয়া যায়, দিলে এক মণ সোনা হয়ে ফেরত আসবে। আমরা এভাবে বই পড়েছি। এভাবেই নেওয়া যায় বন্ধুত্বের ওম। ফলে সব পাতারা অবিকল সবুজ হয়ে আমাদের দেহেমনে ঝরে পড়েছে। উচ্চকিত হাসিগুলোকে এক রকম জোয়ার ভাঁটার মত সিম্ফোনি তৈরি করেছে, ঝর্ণার উদ্দামতায় আমাদের এক রকম আহ্লাদ বোধ হয়।

এমনটা হয় আরেক ক্ষেত্রে - এক সঙ্গে ভাল লাগা গান করলে।

ভাই বোন দাদা দিদি বন্ধু কাকা কাকী মামা মামি মাসি মেসো পিসি পিসে এঁদের নিয়ে আমাদের বৃহত্তর যে পরিবার সেখানে প্রায়শ চায়ের মগ হাতে নিয়ে গানের আসর শুরু হয়েছে। এটা নিয়মের বাইরে না, নিয়মের অংশ বলেই তো বরাবর মালুম। কারুর বা চোখের মণির উজ্জ্বলতার দিকে তাকিয়ে গান করলে বোঝা যায় পিলপিলে কুচোকুচো রোদের মত গানটা তার জীবনের দীঘিকে কেমন নাড়িয়ে দিল। যা বলা হয় না, তা ঐ তাকানোতে আছে। গজদন্তী হাসিতে আছে। ওই নারকেল পাতার বীজনে আছে যা আমাদের মার্শাল আর্টস করা ঘামকে শাদা পিনাফোরের ওপর শুকিয়ে দিচ্ছে। ওই সকলের উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে আছে 'আমার সোনার বাংলা' শুনে, আরেক বাংলায়, হলঘরে। গানের পরে বাতাস কেমন উদাস হয়ে যায়। এমন কয়েক লহমার স্তব্ধতা, যা শব্দ দিয়ে বলতে ভালো লাগে না।

এমনকি আমাদের বাড়িতে একমাত্র একবার পুলিশ আসার ঘটনা ছিল গানকে কেন্দ্র করেই। তখনো আমি প্রবাসী পাখি। কণ্ঠ হতে গান কেউ ভুলিয়ে নিতে পারেনি। দেদার দেবব্রত শুনি। খেপে গিয়েছিল পাসের ঘরের পড়ুয়া মার্কিন ছাত্র। আমি মনে মনে বললাম, ভেড়ুয়া! যাকগে সে কথা!

বুড়ো হচ্ছি তার প্রমাণ, আমরা কেউ কাউকে ভালো লাগা বই দিই না। কেউ কারুর কাছে ভালো লাগা গান তাদের গলায় শুনতে চাই না। কেউ বলি না, আজ মন ভালো নেই, কিছু একটা গেয়ে শোনা। পড়ে শোনা। আমার কাছে যে অনেক দিন হারমোনিয়াম নেই, হাতের কাছে কোলের কাছে ছিল না, সে কথা আমিও অন্যমনস্ক হয়ে খেয়াল করিনি। তৃপ্তি মিত্রর 'অপরাজিতা' ক্যাসেটে একটা অংশ বিশেষে তিনি বলছিলেন 'এডজাস্ট' করার কথা। অনবদ্য থরথরিয়ে দেওয়া অংশ। আমরাও সে ভাবে কারুর নাক, কারুর ঠোঁট, কারুর ভুরু ধার করে এডজাস্ট করেই ছিলাম। একেই বলে বড়ো হওয়া। বুড়ো হওয়া। এই বেখেয়াল থাকাকে।

তাই সে দিন আমার ভাই, ছোটবেলায় যে আমার চেয়ে একটু ছোট ছিল, এখন পর্বতপ্রমাণ, যখন মটরসাইকেলে চেপে ইদিক এসে আমকে তার ভালো লাগার একখানা বই পড়তে দিয়ে গেল, এমন মামুলি কথাটা বলতে গিয়ে মনে হল, বইটার মূল্য আমার কাছে অসীম ছিল সে কথা বলতে চেয়েও বেশি মনে পড়ছে, ছোটবেলার সেই অযাচিত অমূল্য দানকে -- যেন সত্তার অংশকে লহমায় ভাগ করে পাওয়া। আমাকে কেউ এখনো তাদের সত্তার অংশ ভাগ করে দিতে চায়, সেটা ছিল তার প্রমাণ।

২০১৮ ০৪ ০৮

চোখের নিচে অঙ্গার

চোখের নিচে অঙ্গার জ্বলে ওঠে ক্রোধে আর প্রতিহিংসায়। আমরা সেসব দেখেছি। আহত অহংকার আর গা-জ্বলে যাওয়া মানুষের একটেরে বিষণ্ণ হাসি দেখার পরে আকাশের ছাঁকনিতে জমে-যাওয়া কাজলের টিপ পরে নিতে হয়। তাহলে কিছু ফাঁড়া কাটে।

কান্নার, বাজের শব্দ করে অনেক পাহাড় ভেঙে ঝর্ণা নামে -- অথচ সে পর্দার পেছনেই থাকে নীরব মাটির গভীর সুড়ঙ্গ পথ। যারা ঝর্ণা ভয় পায়, তারা ঐ পথকে দেখেনি।

ছুরি বসাতে হাতের আহামরি সংস্কার, সে এক অন্য জন্মে কী নিরুপদ্রব জীবনের লোভে ধীরে ধীরে পাতার বুক চিরে নেয়, উড়িয়ে দেয়, ফুলের রেণু ফুঁ দিয়ে ঢেলে দেয় বহতা স্রোতে। কী সুন্দর সব ক্ষতি অস্বীকার করে চলে যায় ডরিয়ান গ্রের মত।

একটা মাথা দুই হাতে নিয়ে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। জীবনের কাদায় ঘেমে যাওয়া, কামনা বাসনায় ক্লান্ত আর হিংসা, ক্লান্তিতে অশ্রুময়।

২০১৮ ০৪ ০৮

মঙ্গলবার, মার্চ ২৭, ২০১৮

মাটির প্রজার দেশে

মাটির প্রজার দেশে -- বেশ ভালো লাগল। কিছু নিটোলতার অভাব থাকলেও আন্তর্জাতিক মান-সম্পন্ন নাড়া দেওয়া ছবি। কাস্টিং বেশ ভালো - ধন্যবাদ জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে। সিনেমাটোগ্রাফি-তে বাংলাদেশ এখন সেরা কাজ করছে। কাস্টিং ভালো ব'লে অভিনয়ও তাই বলে আমার মনে হয়। আবহ সংগীত দুর্দান্ত। যথেষ্ট ভালো মানের প্রেক্ষাঘর না পেলে হয়ত বোঝা যাবে না ততটা। ন্যারেটিভ একটু খাপছাড়া মনে হলেও সব মিলিয়ে ভালো লাগতেই হবে। কারণ এক সাত বছরের শিশু দেখেটেখে শেষে বলে বসল, 'এত ভালো সিনেমা!'

*পুনশচঃ একজন হুজুরের মুখ থেকে কিছু কথা বলানো হয়েছে এখানে। উচিত কথা, মানবিক কথা। আমার ধারণা বৃহত্তর সমাজের দিকে তাকিয়ে এই ব্যাপারটা করা হয়েছে। এই প্র্যাক্টিকালিটি-কে নানা ভাবেই দেখা যায়। আমি দেখতে পাই শিল্পকে একটু পিছিয়ে রাখা হল সকলের মন জয় করতে গিয়ে, এমন ভাবে।

'মাটির ময়না'র কথা মনে পড়ে যায়। ছবির শিরোনামের মিলটা কি কাকতালীয়? না হলেও বাংলাদেশের মানুষের মত বলতে পারি, 'কোনো সমস্যা নেই।' প্রশ্ন জাগে, এটা কি তারেক মাসুদের প্রতি কোনো ট্রিবিউট? এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

পরিচালক লেখকের নাম শুধু মাত্র 'বিজন' কেন? এমন নির্জন নাম বেশি দেখিনি। আমাদের এমন ভালো মাপের এক ছবি উপহার দেবার জন্য তাঁকে শতবার অভিনন্দন!

২৬ মার্চ ২০১৮

সোমবার, মার্চ ১৯, ২০১৮

ব্রেনে ব্রাউন chapter 4

"সীমারেখা আছে, এমন কি জনঅরণ্যেও"

আমরা যখন কাছাকাছি আসার দায়বদ্ধতা নিই, তখন আমাদের মুখোমুখি সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বাড়ে। খাবার টেবিলে হোক, অথবা কাজে, অথবা বাজারের লাইনে দাঁড়িয়ে, মানুষে মানুষে সংঘর্ষের ব্যাপারটা বরাবর অস্বস্তিকর। পরিবারের ক্ষেত্রে তো বলাই বাহুল্য। ব্রেনে জানান, তার পরিবারের মতো যদি আমরা হই, তবে সাধারণ বিরক্তি থেকে বিপুল ক্রোধের মুখেও আমরা ভব্যতা আর ভালবাসা ধরে রাখতে জানব।

পরিবারে অথবা সমাজে অথবা অপরিচিত ভিড়ে, সকল মতের উল্টোদিকে একা দাঁড়ানোর সাহস ধরে রাখতে গিয়ে মনে হয় -- এ এক বন্য এলাকা -- এ এক জনঅরণ্য। ব্রেনে বলেন, মাঝেমাঝে তিনি হাল ছেড়ে দিতে চান। বড়ো বেশি লোভ হয় তাঁর স্রোতের মুখে ভেসে ভেসে নির্ঝঞ্ঝাট নিরাপদ অবস্থানে থাকার। কিন্তু তখনই স্মরণে আসে মায়া এঞ্জেলুর কথা -- 'এই পথে চড়া দাম দিতে হয়। আর অবিস্মরণীয় পুরস্কার মেলে।'

কিন্তু ব্রেনের গবেষণায় যে প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছিল তা হল, সীমারেখা কি আদপে আছে? থাকলে, কোথায়? কতখানি আচরণ সহনীয়, আর কখন সেই মাত্রা লঙ্ঘন হয়? এ ভব্য সহনীয়তার পথে পুরস্কার যত অবিস্মরণীয় হোক। আমাদের অস্তিত্বকে যারা আস্বীকার করে, যারা আমাদের ছিঁড়েখুড়ে ফেলে, তাদেরও কি সহ্য করতে হবে? এমন কি কোনো সীমা আছে, যা লঙ্ঘন করা যাবে না? এর উত্তর হল, হ্যাঁ।

ব্রেনের গবেষণায় যারা অংশগহণ করেন, তাদের মধ্যে যারা  নিজেদের অস্তিত্বের কাছে  সাবলীল আর আপন, তারা তাদের সীমারেখার ব্যাপারেও বেশি সোচ্চার। আগে ব্রেনে যে গবেষণা করেছেন তাঁর সঙ্গেও মিলে যায় এই ফলাফল ঃ আমাদের সীমারেখা যত সুস্পষ্ট আর মান্য হবে, ততই সমবেদনা আর করুণার সুযোগ পাব আমরা, অন্যদের জন্য। আমাদের সীমারেখা যত অপরিষ্কার হবে, উদারতা তত কম হবে অন্যদের জন্য। যদি কাউকে সুযোগ বুঝে ব্যবহার করতে থাকে কেউ, অথবা ভয় দেখিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চায়, তখন সেই ব্যক্তির পক্ষে কোমল-হৃদয় থাকা কঠিন বইকি!

ব্রেনে তাঁর উপাত্ত ঘেঁটে দেখলেন, সীমারেখা দুইটি জায়গায় চিহ্নিত হয়। একটি শারীরিক নিরাপত্তার সীমা, আরেকটি অনুভূতির নিরাপত্তার সীমা। শারীরিক নিরাপত্তার ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। আক্কেল থাকলে বোঝা যায় সহজেই। যে কোনো ভাবে সত্যকথনের সাহস (ভালনারেবিলিটি) চর্চা করতে গেলে এই শারীরিক নিরাপত্তার বোধে কোনো আপোস চলে না। যে পরিবেশে শারীরিক নিরাপত্তা নেই সেই পরিবেশে কেউ সত্যি নিজেকে নিজের মতো করে প্রকাশ করবে, এমনটা আশা করা উচিত নয়।

অনুভূতির নিরাপত্তা বোঝা অত সহজ ছিল না। বিশেষ করে এই জন্য, যে কিছু কিছু মানুষের কাছে, অনুভূতির নিরাপত্তা বলতে বোঝায় এই অভিব্যক্তি, "আমার থেকে আলাদা, আমার অপছন্দের, আমাকে যা বেদনা দিতে পারে, অথবা আমি যা সঠিক মনে করি তার থেকে ভিন্ন মত, আমার শোনার দরকার নেই"। এই কারণে, 'অনুভূতির নিরাপত্তা' ব্যাপারটা নিয়ে ব্রেনেকে আরেকটু গভীরে যেতে হল।

 যখন ব্রেনে অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতির নিরাপত্তা কখন কখন লঙ্ঘন হয়েছে ব'লে জিজ্ঞাসা করে দৃষ্টান্ত চাইলেন, তখন ভুরি ভুরি এমন দৃষ্টান্তই পেলেন, যা থেকে একটা পরিষ্কার প্যাটার্ন পাওয়া গেল। তারা সাধারণত নিজের থেকে ভিন্ন মত শুনতে বাধ্য হয়েছেন এমনটা বলেননি, তারা বলছিলেন তাদের মানবতাকে খাটো করে তুলে ধরা কিছু উক্তি আর আচরণের কথা। ব্রেনে পুরোনো গবেষণায় দশ বছর ধরে ডিহিউম্যানাইজেশন অথবা মানবেতর হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা নিয়ে কাজ করেছেন ব'লে সেটা তাঁর বুঝতে বেগ পেতে হল না।

ডেভিড স্মিথ তাঁর বই 'লেস দ্যান হিউম্যান'-এ বলেন, যে মানবেতর হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দুইটি সংঘর্ষে আসা মতের ভিতর থেকে তৈরি হয়। আমরা একটা গোষ্ঠীর ক্ষতিসাধন করতেই চাই, কিন্তু মানুষ হিসেবে অপর মানুষের ক্ষতি করা, নির্যাতন করা, মেরে ফেলা, উৎপীড়ন করার ব্যাপারে, আমাদের অন্তরে বাধে। স্মিথ জানান, আমাদের মানবপ্রকৃতির মধ্যেই নিহিত আছে সেই বাধা -- মানুষের সঙ্গে পশুর মত, শিকারের মত ব্যবহার করার ব্যাপারে আমরা অপারগ। মানুষকে মানবেতর হিসেবে তুলে ধরতে পারলে কিন্তু সেই প্রকৃতিগত বাধা অনায়াসে অতিক্রম করা যায়।

ডিহিউম্যানাইজেশন বা মানুষকে মানবেতর ভাবে তুলে ধরার প্রবণতা একটা প্রক্রিয়া। মিশেল মেইজ, এম্যানুয়েল কলেজের দর্শনের অধ্যাপক এই ব্যাপারে যা বলেছেন তা বোঝা সহজ বলে এখানে তাঁর কিছু কথা ব্যবহার করা যায়। মেইজ ডিহিউম্যানাইজেশনকে চিহ্নিত করেন এ ভাবে "শত্রুকে মনোস্তাত্বিক ভাবে দানব হিসেবে প্রতিপন্ন করা, এই উদ্দেশে, যেন তাদের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করতে না হয়।" আমরা যদি কোনো পক্ষ নিয়ে দাঁড়াই, বিশ্বাস হারাই, ক্রোধে যত উত্তপ্ত হয়ে উঠি, তত শত্রুর ধারণাকে অন্তরে আরো কঠিন করে অনুভব করি। শুধু তাই-ই নয়, একই সঙ্গে আমরা বধির হয়ে উঠি, যোগাযোগ করার দক্ষতা হারাই, লুপ্ত হয় আমাদের সহমর্মিতা।

আমরা যখন কোনো সংঘর্ষের 'উল্টো দিকে'-র লোককে নীতিগত ভাবে ইতর বা বিপজ্জনক ব'লে মনে করি, তখন সেই সংঘর্ষ হয়ে ওঠে ভালো আর মন্দের দ্বন্দ্ব। মেইজ লেখেন, "দলগুলি যখন তাদের দ্বন্দ্বকে এই ভাবেই তুলে ধরেন, তাদের অবস্থান আরো অনমনীয় হয়ে ওঠে। কখনো কখনো বিফল হয় সমস্ত ইতিবাচক ভাবনা, কারণ দলগুলি মনে করে -- হয় জিততে হবে, নয়ত হারতে হবে। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা বা শাস্তি দেবার আরো নতুন কলাকৌশল উঠে আসতে থাকে। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতিতে আরো জঙ্গি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে।"

মানবেতর ভাবে মানুষকে তুলে ধরা নানা হিংসাত্মক ঘটনার মূলে; মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধ অপরাধ, এবং গণহত্যার পেছনে এইটাই কাজ করে। এর জন্য সম্ভব হয়েছে মানুষকে ক্রীতদাস বানানো, নির্যাতন, এবং মানব-পাচার। মানবেতর ভাবে মানুষকে তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে আমরা মানুষের প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে শুরু করি, মানুষের আত্মার বিরুদ্ধে কাজ করি, এবং মজ্জাগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শুরু করি।

কী ভাবে ঘটে এমন? মেইজ বলেন, আমরা প্রায় সকলেই ভাবি, মানবিক অধিকার লঙ্ঘন করা উচিত নয়। সুতরাং হত্যা, রেপ, নির্যাতন, এসব ভ্রান্ত কাজ। কিন্তু যদি সফলভাবে মানুষকে মানবেতর হিসেবে প্রতিপন্ন করা যায়, তখন ওই নিয়মের যে ব্যতিক্রম আছে, এমনটা আমরা মেনে নিই। তখন দলীয় পরিচয়ে -- কখনো লিঙ্গ, কখনো চামড়ার রঙ, কখনো ধর্ম, কখনো জাতীয়তার ভিত্তিতে মানুষকে আমরা 'মানুষের চেয়ে কিছু কম' অথবা 'অপরাধী' অথবা 'শয়তান' ব'লেও চিহ্নিত করতে শিখি। তখন তারা আর আমাদের নীতিগত আশ্রয়ের মধ্যে পড়ে না। এটাকে বলা হয় মোরাল এক্সক্লুশন (নীতিগত ব্যতিক্রম) এবং ডিহিউম্যানাইজেশন বা মানবেতর ভাবে মানুষকে তুলে ধরা এর মূলে।

মানুষকে আমরা মানুষের চেয়ে খাটো করে তুলে ধরি প্রথমত শব্দের মাধ্যমে। তারপর ভাবমূর্তির মাধ্যমে। ইতিহাসে প্রচুর দৃষ্টান্ত আছে। নাৎসিরা ইহুদিদের বলত -- মানবেতর। তারা ইহুদিদের জীবানু বয়ে বেড়ানো ইঁদুরের সঙ্গে তুলনা করত, তাদের সামরিক খাতায় এবং ছোটদের বইতে। রুয়াণ্ডার গণহত্যায় হুটুরা টুটসিদের বলত, আরশোলা। আদিবাসী মানুষদের আমরা প্রায় বলি অসভ্য। সার্ব-রা বসনিয়ার মানুষকে বলত, ভিনগ্রহের জন্তু। প্রভুরা চিরকাল ক্রিতদাসদের মানবতের পশু ব'লে অভিহিত করে এসেছে।

আমরা নিজেরা এমনটা কখনো করতে পারি -- কিছু মানুষকে ঠেলে মানুষের চেয়ে খাটো করে তুলে তাদের প্রতি আমাদের মানবিক মর্যাদা আর নীতিবোধকে এড়িয়ে যেতে পারি, এ আমাদের কাছে অবিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু এ হল জীববিজ্ঞানের কথা। আমরা এমন ভাবে প্রকৃতির হাতে তৈরি, যে প্রতিটা শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেটার সঙ্গে আমরা একটা ছবি তৈরি করে ফেলি। আমরা জানি গণহত্যায় অংশ নেওয়া অথবা মদদ দেওয়া প্রত্যেকটা মানুষ সাইকোপ্যাথ হতে পারে না, সেটা অসম্ভব। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কথা হল, আমরা যদি তাই মনে করি, তাহলে আমরা আসল সত্য থেকে আরো দূরে চলে যাব। সত্য হল, আমরা প্রত্যেকেই একটু একটু করে মানুষকে মানুষের চেয়ে খাটো করে দেখতে পারি, যদি চর্চাটা প্রাত্যহিক হয়। সুতরাং আসল কথা, এই ব্যাপারে আমাদের সবাইকেই সচেতন হতে হবে এবং চিহ্নিত করে থামাতে হবে।



"আমাদের মানবতাকে বুকে জড়িয়ে ধরার সাহস"

'সময়ের পরীক্ষায় দেখতে পাই, অনেক প্রতিষ্ঠিত সিস্টেম ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিছু মানুষকে মানবেতর প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। তাই আমাদের উল্টো কাজ হবে মানবিকীকরণ (rehumanizing)। কাজটা মানুষকে মানবেতর প্রতিপন্ন করার মতোই, বিশেষ এক জায়গা থেকে শুরু হয়। জায়গাটা হল শব্দ আর ছবির ব্যবহার। আমরা ক্রমশ এমন এক দুনিয়ায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে রাজনীতি আর আদর্শের লড়াইগুলি ভর করে আছে মানুষকে মানবেতর প্রতিপন্ন করার ওপরে। সামাজিক মাধ্যমগুলি সেই প্ল্যাটফর্ম -- যেখানে দাঁড়িয়ে এই কাজ করা হয়। টুইটার বা ফেসবুকে আমরা দ্রুত আমাদের সঙ্গে যাদের অমত, বিপজ্জনক ভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারি নীতিগত ময়দান থেকে। অর্থাৎ কিনা তাদের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত নীতিবোধ আর কাজে লাগাব না ব'লে মেনে নিয়ে। তাদের জন্য আমরা জবাবদিহিতা দিতে প্রস্তুত থাকব না, এই রকম একটা অবস্থানে এসে। তাদের সম্পূর্ণ নামহীন এক অজ্ঞাতবাসে পাঠিয়ে দিয়ে।

আমি বিশ্বাস করি --

১। হিলারি ক্লিন্টনকে যদি 'কুত্তী' বা 'বেশ্যা' ব'লে কেউ গালাগালি করলে আমাদের খারাপ লাগে, তবে, অনুরূপ গালাগালি ইভাঙ্কা ট্রাম্প-কে করলেও আমাদের আপত্তি থাকার কথা।

২। হিলারি ক্লিন্টন যখন ট্রাম্পের অনুগতদের 'এক বস্তা ঘৃণা' বলে অভিহিত করেন তখন যদি দুঃখ হতে থাকে, তবে, এরিক ট্রাম্প যখন বলেন, 'ডেমোক্র্যাটরা মানুষ নয়' তখনও উৎকণ্ঠিত হবার কথা।

৩। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি যখন নারীদের 'কুকুর' বলে অভিহিত করেন, এবং তাদের নিতম্ব খামচে ধরার কথা বলেন, তখন আমাদের শিরদাড়া বেয়ে শীতল বরফ নামে, আমাদের শিরা বেয়ে প্রতিরোধের আগুন বাহিত হয়। যখন লোকে সেই রাষ্ট্রপতিকে 'শুয়োর' বলে গালাগালি করে, তখনো আমাদের সেই ভাষাকে বিনাবাক্যে পরিহার করতে হবে।

৪। যখন যে-কোনো গোষ্ঠী বা মানুষকে পশু অথবা ভিন গ্রহের বলে অভিহিত করা হয়, তখন আমাদের সঙ্গেসঙ্গে মনে করতে হব, 'এই মানুষের মানবতাকে ছিলে নেবার এক প্রচেষ্টা চলছে নাকি? যাতে সহজেই তার ওপর আঘাত হানা যায়? যেন যে-কোনো মানবাধিকার সহজেই লঙ্ঘন করা যায়?

৫। ট্রাম্পকে ফটোশপ করে হিটলারের আদল দেওয়ায় আমাদের যদি আপত্তি থাকে, তাহলে আমাদের নিজেদের ফেসবুক দেওয়ালে ওবামাকে ফোটোশপ করে জোকার হিসেবে তুলে ধরা উচিত হবে না।

একটা সীমারেখা আছে। সেটা মর্যাদাবোধের আঁচড়ে সুচিহ্নিত। এবং রাজনীতির ডানপন্থী, বামপন্থী, সন্ত্রাসবাদী এবং প্রগতিবাদী সকলেই -- সেই সীমারেখাকে উঠতে বসতে লঙ্ঘন করে চলেছেন।

মানুষকে মানবেতর ভাবে প্রতিপন্ন করা -- আমাদের কখনো কোনোভাবে সহ্য করা উচিত নয়। কারণ উৎপীড়নের একটা অমোঘ হাতিয়ার এটা। প্রত্যেক গণহত্যার পিছনে এটাই কাজ করে।


একটা সীমারেখা আছে। সেটা মর্যাদাবোধের আঁচড়ে সুচিহ্নিত। এবং রাজনীতির ডানপন্থী, বামপন্থী, সন্ত্রাসবাদী এবং প্রগতিবাদী সকলেই -- সেই সীমারেখাকে উঠতে বসতে লঙ্ঘন করে চলেছেন।

মানুষকে মানবেতর ভাবে তুলে ধরা -- আমাদের কখনো কোনোভাবে সহ্য করা উচিত নয়। কারণ উৎপীড়নের একটা অমোঘ হাতিয়ার এটাই। প্রত্যেক গণহত্যার পিছনে এটাই কাজ করে।

আমরা যখন মানুষকে মানবেতর ভাষায় এবং ছবি দিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করি, তখন একই সঙ্গে আমরা নিজেদের মানবতাকে ধ্বংস করি। আমরা যখন মুসলিমদের ঢালাও ভাবে 'সন্ত্রাসী' অথবা মেক্সিকানদের এক কথায় 'ইললিগাল' অথবা পুলিশ অফিসারদের 'শুয়োর' হিসেবে তুলে ধরি, যাদের উদ্দেশ্য করে এ সব কথা বলা হল, তাদের সম্পর্কে আসলে কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। বোঝা গেল আমাদের সম্পর্কে। বোঝা গেল এই কথা, যে আমরা নিজেদের অখণ্ড পূর্ণতা বোধের ওপর ভর করে কতোখানি কাজ করছি।

মানুষকে মানবেতর হিসেবে তুলে ধরে হেয় প্রতিপন্ন করা, আর মানুষের কাছে জবাবদিহিতা দাবী করা, এ দুই পারস্পরিক ভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যাপার। মানুষকে লজ্জা দেয়া (humiliation) অথবা মানবেতর প্রতিপন্ন করা (dehumanization) জবাবদিহিতা অথবা সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার নয়। এগুলো কম করে হলে আবেগের ভার নামানো বা গায়ের ঝাল মেটানোর ইচ্ছা। বেশি করে হলে ঝাল মেটানর জন্য অন্যের ওপর আক্রমণ।

আমাদের বেঁচে থাকার মানদণ্ড কে তুলতে হলে অবিরাম সচেতনতা আর পরিশ্রম লাগে।  আমরা কিছু কিছু শব্দ আর ছবির ব্যবহারে এতোটাই অভ্যস্ত যে নীতিগতভাবে কিছু মানুষ যে ব্যতিক্রমের খাতায় পড়বে এ কথা আমরা স্বাভাবিক ভাবে ধরে নিয়েছি।  সচেতনতা আর পরিশ্রমের বাইরে আমাদের লাগে সাহস। কারণ শত্রুদের বিরুদ্ধে এমন মানবেতর প্রতিপন্ন করা ক্যাম্পেইন চালালে অথবা সকলকে এক নীতিবোধের আওতায় আনতে চাইলে, সে মানুষকে অনেক সময় খুব কঠোর পরিণাম ভুগতে হয়।

আমরা যদি নাগরিক হিসেবে সব নাগরিক এক -- এই ভাবে ভাবি, তাহলে কি আমাদের চিৎকার করে বলা উচিত -- সব জীবনের দাম আছে? না। কারণ সব জীবন থেকে তো মানবতা বরবাদ করে দেওয়া হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে যেভাবে হয়েছে। ক্রিতদাস প্রথা যেন নিটোল ভাবে কাজ করে, কৃষ্ণাঙ্গদের কেনা, বেচা, মারধোর করা, পশুদের মত তাদের নিয়ে বাণিজ্য করা, এসবের জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের সম্পূর্ণ ভাবে মানবেতর মনে করতে (dehumanize) হয়েছে। আজকের মার্কিন নাগরিক সেই সংস্কৃতিতে বড়ো হয়েছে ব'লে তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে। এই ইতিহাস আমেরিকানদের মনের গড়ন আপনা আপনি তৈরি করে দেবে। এই মানবেতর মনে করাকে এক বা দুই প্রজন্মে মুছে দেওয়া যায় না।

(ব্রেনে ব্রাউন পড়তে পড়তে ভাবি, সে ভাবেই আমাদের সংস্কৃতিতে আমরা অবাঙালি আদিবাসী আর প্রান্তিক সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠী, কৃষক, মজুর, নারীদের যে ভাবে মানবেতর বলে মনে করি, সে সংস্কৃতি নিশ্চয়ই হরেদরে আমাদের চিন্তার গড়নকে তৈরি করে দেয়। তাই সব জীবনের দাম আছে, এ কথা বলা দরকার না থাকলেও এসব গোষ্ঠীর জীবনের যে দাম আছে, তা আমাদের বারবার বলতে হবে।)

পুলিশ এবং এক্টিভিস্টকে যুগপৎ সমর্থন করার মধ্যে কি টানাপোড়েন নেই? আলবাত আছে। এই সেই জঙ্গল। সেই জন-অরণ্য। কিন্তু সব চেয়ে বেশি সমালোচনা আসে তাদের কাছ থেকে যারা 'এটা' অথবা 'ওটা'-কে বেছে নেবার  দ্বৈততা আরোপ করার জন্য ব্যগ্র। 'ঘৃণার পাত্র'-দের ঘৃণা না করার জন্য যারা আমাদের লজ্জিত করতে চান। এই সূক্ষ্ম অবস্থান বেছে নেওয়া জটিল এবং কঠিন, কিন্তু নিজের কাছে অনুগত থাকতে গেলে, নিজ অস্তিত্বের কাছে আপন হতে গেলে (true belonging), এমনটাই করতে হয়।

কোনো সংগঠনের সংস্কৃতি যখন আমাদের শেখায়, ক্ষমতাবানদের, আর সিস্টেমের মান-সম্মান, সেই সিস্টেমে অংশ-নেওয়া ব্যক্তি-মানুষের মানবিক মর্যাদার চেয়ে বড়ো, তখন বুঝতে হবে লজ্জাকে (Shame) রীতিমত সব নিয়মের আওতায় আনা হয়েছে, টাকাকড়ি নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, এবং জবাবদিহিতা ধুঁকে মরছে। এই বাস্তবতা করপোরেট জগতে যেমন সত্য, তেমন সত্য এন. জি. ও., সরকারী, বেসরকারী সংস্থায়, ধর্মীয় সংগঠনে, ইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখান একটা স্ক্যান্ডেল ঘটে যাবার পরে দ্রুত তা ধামাচাপা দেওয়া হয়, সেসব ক্ষেত্রে তো বটেই। ধামাচাপা সত্যের পুন্রুদ্ধার, এবং সমাধান কিন্তু সেই জন-অরণ্যেই হয়, যখন একটিমাত্র ব্যক্তি তাঁর নিরাপদ আস্তানা থেকে বেরিয়ে সাহস করে নিজের মত সত্য কথা বলতে থাকেন।

আমাদের পথ তাই "খাপে খাপে মিলে যাওয়া" থেকে পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় জন-অরণ্যে জংলি অবস্থার মধ্যে বেদনালিপ্ত পদপাত, কারণ একমাত্র সে ভাবেই আমরা সব কিছুর সঙ্গে আপন হতে পারি (true belonging), এবং এই কাজ করতে গিয়ে অন্যদের শারীরিক নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা যে কত জ্রুরি সে কথা বুঝলে আমাদের সাহায্য হতে পারে। অন্যদের সীমানাকে শ্রদ্ধা করেই আমরা সেই সব সংগঠনের বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হবো না, যারা (যে কোনও) মানুষকে মানবেতর ভাষায় বা আঙ্গিকে তুলে ধরে (dehumanize)। মানুষকে মানবেতর ভাষায় তুলে ধরলে শুধু অল্পবিস্তর 'অনুভুতির নিরাপত্তা' বিঘ্নিত হয়, এমন মনে করা ভুল। মানবেতর ভাবে তুলে ধরা আরো গভীর ছাপ রাখে আমাদের সমাজে। আমরা এখানে আহত অনুভুতির কথা বলছি না, বলছি হিংস্রতা, উৎপীড়ন আর শারীরিক ঝুঁকির মূল বুনিয়াদের কথা।

"দ্বন্দ্বের রূপান্তর" (Conflict Transformation)

সদা সত্যের পথে থাকার সাহস সহ, এবং 'সাহসী সক্ষম নিজ' হতে গেলে দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে পথ খুঁজে বের হবার ছেনি-বাটালি যন্ত্র আমাদের হাতে থাকতে হবে। আমি আমার বন্ধু ডক্টর মিশেল বাক-কে প্রশ্ন সাহায্য করতে বলি।  বাক একজন ক্লিনিকাল নেতৃত্ব প্রবর্তনার অধ্যাপক -- কেলগ ব্যবস্থাপনা স্কুল, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি এই স্কুলের নেতৃত্ব প্রবর্তনার প্রথম পরিচালক। গত বিশ বছর তিনি দ্বন্দ্ব রূপান্তর নিয়ে কাজ করেছেন। আমরা সংঘর্ষের সময় নিজেদের যে ভাবে পরিচালিত করি, এই ব্যাপারে তাঁর পথ কিছু জরুরি পরিবর্তন আনতে পারে। নিচে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার তুলে দিচ্ছি। তাঁর নিজের কথা খুব শক্তিশালী ব'লে সেভাবেই তা রেখে দিয়েছি।

ব্রেনেঃ আমরা যখন বিহ্বল লাগে, তখন আমার মনে হয় আমি "চুপচাপ দ্বিমত পোষণ করার" সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।  এই সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

বাকঃ লোকে কখনো কখনো নিজেদের সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেয়, চুপ করে থাকে, অথবা "দ্বিমত পোষণ করার' মৌন সিদ্ধন্ত নেয়, অথচ দ্বিমতগুলিকে সঠিক ভাবে বুঝতে চেষ্টা করে না। হয়ত তারা একটা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য, বা সংযোগ ধরে রাখার জন্য এমনটা করে। কিন্তু কিছু কিছু আলোচনা যদি না করি, তাহলে অন্য ব্যক্তি সে ব্যাপারে কেমনটা ভাবছে, তা কখনো জানা যাবে না।  এতে ভুল বোঝা, আর গড়পড়তা অসন্তোষ বাড়বে শুধু। বরং 'তর্ক' হলে হয়ত অসন্তোষটা একটু কম হত। চাবিকাঠি হল দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে এমন ভাবে এগোনো যাতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে, যত মতপার্থক্য থাক। কল্পনা করুন -- একটি অর্থপূর্ণ আলোচনার পরে দুই ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযোগ বেড়ে গেল, অথচ তারা কিন্তু মতের দিক থেকে এক জায়গায় এলেন না। আলোচনা এড়িয়ে গিয়ে অপর পার্টির কাছ থেকে কিছু না নেবার থেকে -- বিষয়টা কতো আলাদা।

ব্রেনেঃ তাহলে আমরা আলোচনার টেবিলে থাকতে গেলে, কী ভাবে সত্য কথনের সাহসে দাঁড়িয়ে ভদ্রতা, ভব্যতা বজায় রাখতে পারি?

বাকঃ আমি আমাদের নির্বাহী অফিসার আর ছাত্রদের বলে থাকি -- ভিতরকার অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য কী, সেটাকে আগে তুলে ধরুন। আলোচনাটা কী নিয়ে, ভিতরে ভিতরে --  কী নিয়ে? শুনতে মনে হয় সরল, কিন্তু অতো সহজ নয়। এই বিষয় ওই মানুষের গহন মনে এতো জরুরি বিষয় কেন -- সেটাই হল অভিপ্রায়। অন্য মানুষটার কাছেও এই বিষয়টি এতোটা জরুরি কেন, তাও। যেমন -- ধরা যাক পারিবারিক উৎসব পালনের ব্যাপারে পরিবারের দুই জন সদস্যের ভিতরে মতান্তর হচ্ছে। এদের মধ্যে একজন বা দুই জনের অভিপ্রায় হয়ত এমন -- যে এই উৎসব পালনের মাধ্যমে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে আরও সংযোগ ঘটুক। কিন্তু যে-ব্যাপার নিয়ে মতান্তর ঘটছে, সেখানে এই অভিপ্রায়ের কোন ছিটেফোঁটা উল্লেখ নেই। আমাদের গভীর অভিপ্রায়কে শব্দে তুলে ধরা মানে এই নয় যে আচমকা আমাদের দুই জনের মতের মিল হয়ে যাবে।  কিন্তু  নিজের এবং পারস্পরিক গভীর অভিপ্রায় বুঝতে পারলে কঠিন আলোচনার ভিতরেও সংযোগ ঘটানো বা সংযোগ টিকিয়ে রাখা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়।

ব্রেনেঃ আমি যখন শঙ্কিত, তখন আমার সবচেয়ে খারাপ প্রতিরোধ, আমি মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিই। উকিলের মত দাঁড় করিয়ে কথা বলে যাই এবং তার কথা শুনি না। "গত সপ্তাহ তুমি এমনটা বলেছিলে, আজ তুমি আরেক রকম বলছ, তাহলে মিথ্যে বলছিলে কখন? আজ না গত সপ্তাহ?" এরকম ব্যাপারগুলো হয় -- সাধারণত এর পরিণতি ভয়াবহ কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি আসলে চেষ্টা করছি "সঠিক" বলে নিজেকে প্রতিপন্ন করার। এর সমাধান কী?

বাকঃ মানুষের জন্য এটা সাধারণ কৌশল বটে। কিন্তু আমরা যদি একটা তর্ককেই সংযোগ-স্থাপনের সুযোগ হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে যা ঘটেছে, যা ঘটছে আর যা ঘটবে -- এর মধ্যে সীমারেখা টানতে হবে। আগে যা ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে যখন তর্ক হয়, তখন "তুমি বলেছিলে - আমি বলেছিলাম"-এর ভলিখেলার মধ্যে পড়ে যেতে হয়।  আগে কী ঘটেছে তা বর্তমানে নিয়ে এলে সাধারণত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, এবং মানসিক চাপ বাড়ে। এই অবস্থায় মনে করতে হবে, "এই মুহূর্তে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?" আর তার চেয়েও জরুরি -- আমরা যেন ভবিষ্যতের কথা ভাবি। আমরা ভবিষ্যতে কী পেতে আশা করি? আমাদের সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে কেমন হবে বলে আমরা চাই, এবং অমত সত্ত্বেও সেই ভবিষ্যৎ কী ভাবে আমরা পেতে পারি? আমরা আমাদের পরিবারের জন্য, আমাদের সংঘের জন্য, আমাদের দলের জন্য, আমাদের শিল্পের জন্য, ভবিষ্যতে কী চাই? এই ভাবে দেখতে শুরু করলে যে আমরা মতে মিলব তা হয়ত নয়, তবে এক সম্মিলিত ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমাদের একটা সহমত তৈরি হতে পারে।

ব্রেনেঃ আমার ভালো লাগে যে আপনি এঁকে 'দন্দ্বের সমাধান' না বলে 'দ্বন্দ্বের রূপান্তর' বলছেন। মনে হল যেন আপনি সংযোগের কথা বলছেন। এই দুইয়ের মধ্যে তফাত কী?

বাকঃ সব কাজে আমি 'দ্বন্দ রূপান্তর'-এর কথাই ভাবি। দ্বন্দ্ব নিরসনের কথা নয়। যদিও সেটাই গতানুগতিক ধারণা। আমার কাছে মনে হয় দ্বন্দ্ব নিরসনে একজন জিতবে আরেকজন হারবে। অথবা কোনও এক পেছনের ঘটনায় ফিরে যেতে হবে। অন্য দিকে দেখুন, দ্বন্দ্ব রূপান্তর বলতে মনে হয় আমরা দ্বিমতের মানচিত্রে হেঁটে নতুন কিছু তৈরি করতে পারছি। কম করে হলে, পরস্পরকে আরেকটু জানার সুযোগ পাচ্ছি। আমরা যদিও চাইছি, এমন কোন সমাধান আসুক, যা আমরা আগে ভাবতে পারিনি। দ্বন্দ্ব রূপান্তর হল গভীরতর সমঝোতা তৈরির পথ। ফলে সংযোগ বাড়ে, মত না মিললেও বাড়ে।

ব্রেনেঃ শেষ প্রশ্ন করি! আমি বেশির ভাগ সময় যখন অন্য লোকে কথা বলে তখন পাল্টা যুক্তি তৈরি করতে ব্যস্ত থাকি। আমি চাই 'পালটা যুক্তি'  তাদের কথার পিঠে ছুঁড়ে দিতে। কিন্তু অন্যেরা যখন সেই একই কাজ আমার সঙ্গে করে আমার ভারি খারাপ লাগে। আমি বুঝতে পারি তারা আমার কথা শুনলই না। কী বিশ্রী অনুভূতি! দ্বন্দ্বের মাঝখানে কী ভাবে ধীরে এগোতে হবে?

বাকঃ রূপান্তরের জন্য যে আলোচনা, সেখানে সব চেয়ে সাহসী কাজ মুক্তমন হওয়া শুধু নয়, বরং তীব্র ইচ্ছা নিয়ে অন্যের দিকটা শোনা। আমি বিশ্বাস করি, এবং আমার ছাত্রদের প্রায়শ বলে থাকি, একটা অস্বস্তিকর আলোচনার মধ্যে বলতে হবে, 'আমি আরো শুনতে চাই'। ঠিক যে মুহূর্তে আমার সেখান থেকে সরে যেতে, আলোচনা থেকে গুটিয়ে নিতে, পাল্টা যুক্তি তৈরি করতে ইচ্ছে করছে, তখনই আমাদের সুযোগ আছে অপরের দৃষ্টিকোণ জানার। আমাকে বুঝতে দাও -- এই বিষয় তোমার কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন, বুঝতে সাহায্য করো -- কেন আমার এই মতের সঙ্গে তুমি মিলতে পারছ না। আর তারপর আমাদের শুনতে হবে কান খাড়া করে। বুঝতে হলে শুনতে হবে। মতে মিলল কি মিলল না সেটা বড়ো কথা নয়। আমরা যেমন চাই কেউ আমাদের বুঝুক, তেমনি আমাদেরও তাদের বুঝতে হবে।

বেদনা থেকে উৎসারিত সাহস আর শক্তি ঃ ভিয়োলা ডেভিসের সঙ্গে সক্ষাতকার

এই অধ্যায় আমি একটি সাক্ষাৎকার দিয়ে শেষ করতে চাই। ভিয়োলা ডেভিসের এই সাক্ষাৎকার। আপনারা হয়ত অভিনেত্রী হিসেবে তাঁকে চেনেন। 'দ্য হেল্প', 'হাউ টু গেট আওয়ে উইথ মার্ডার' এবং 'ফেন্সেস' (তিনি অস্কারে যার জন্য বেস্ট সাপোরটিং অভিনেতার খেতাব পান) -এ হয়ত তাঁকে দেখেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা হিসেবে তিনিই প্রথম যিনি একাধারে তিনটি পুরস্কার পেলেন - এমি, টোনি আর অস্কার। ২০১৭ সালে টাইমস পত্রিকায় তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ভিয়োলার গল্প থেকে জানতে পারি সাহসের শক্তির কথা, বেদনার মুখে। ভয় নিয়েও সত্য হয়ে দাঁড়ানোর সে গল্প। জানতে পারি কী ভাবে জীবনটা কাছ থেকে বাঁচলে এবং ভালবাসলে নিজের আপন হওয়া যায়।

আমি যখন ভিয়োলাকে তাঁর নিজের কাছে আপন হবার গল্পের শুরু থেকে শুরু করতে বলি, তখন তিনি বলেন, 'আমার জীবনের চার ভাগের প্রথম তিন ভাগ মনে হত একটি গোল ছ্যাদার মধ্যে ঠিক মত বসতে না পারা চৌকো স্ক্রু আমি। শারীরিক ভাবেই বেমানান লাগত  নিজেকে। ছিলাম রোড আইল্যান্ডের এক ক্যাথোলিক আইরিশ পল্লীতে। ্সেখানে সচারাচর লম্বা সোনালি চুল মেয়েদের দেখা যেত বেশি। আমার কোঁকড়ানো কালো চুল, কালো চামড়া, উচ্চারণ আলাদা। সুন্দর দেখতে নই। মারাত্মক দারিদ্র্যে বড়ো হবার ধ্বস্ততার চিহ্ন আমার মধ্যে। আমি একজন অতরিক্ত মদ খেয়ে মাতাল থাকা বাবার মেয়ে। বারো তেরো বছর পর্যন্ত আমি আমার বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছি। আমার গায়ে বোটকা গন্ধ। শিক্ষকরা অভিযোগ করতেন এই ব্যপারে। পাঠিয়ে দিতেন নার্সের অফিসে। আমার সব কিছু ভুলে ভরা। এটাই আমার শুরু।

'আমার নিজের কাছে আপন হবার ভাষা ছিল টিকে থাকার ভাষা। আজ কি একটা গরম জলে স্নান করতে পারি? আজ কি টেবিলে খাবার আছে? বাবা কি আজ মা-কে খুন করবে? বাড়িতে কি ইঁদুর হবে?

'আমার কোনো হাতিয়ার ছিল না -- আমি এই মানসিক যন্ত্রণা, ভয়, এই দুর্ভাবনা, এবং নিজের জন্য উঠে দাঁড়াতে না পারার অক্ষমতা নিয়ে বড়ো হয়েছি। এই সব লজ্জার ভিতরে গভীর প্রোথিত ছিল। আমি আমার সবটুকু শক্তি আমার জীবনের এই ধ্বস্ত চিত্র লুকিয়ে রাখতেই ব্যয় করতাম। এই অকার্যকর জীবন নিয়ে আমি বড়ো হয়ে গেলাম।'

তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর নিজস্ব জন-অরণ্যে প্রথম কয়েক পা ফেলার কথা যেন তিনি বলেন আমাদের। তিনি বললেন, 'আমি জানতাম আমি সামনাসামনি সংঘর্ষ ভয় পেতাম। কিন্তু থেরাপি শুরু হবার আগে আমি বুঝতে পারিনি কেন আমার পক্ষে সোচ্চার হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। আমার একজনের বিরুদ্ধে কথা বলা দরকার ছিল, যিনি আমার সঙ্গে খুব খারাপ কিছু করে চলে ছিলেন। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমি সে চৌদ্দ বছর বয়েসের মেয়ে হয়ে গেছি। আমি আমার শিশু বোনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বাবা আমার মার গলায় পেনসিলের বাঁট পেরেকের মত ঠুকে ঠুকে মারছেন। আমি চিৎকার করে বলেছিলাম, 'থামো। পেনসিলটা আমাকে দাও।' তিনি তাই দিয়েছিলেন। আমাকে শিশু অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মুখোমুখি সোচ্চার হতে হয়েছিল।  আমাকে সেই শক্তির অবস্থান প্রস্তুতি না নিয়েই নিতে হয়েছিল, অতোটা আগে এমন হওয়া উচিত হয়নি। সেই কারণে আমার এর খেসারত দিতে হল ভয়ের মাধ্যমে।'

ভিয়োলা এমন একজন যিনি জনঅরণ্যে ভয়-কে সাহসী পদচারণায় রূপান্তরিত করেছেন। আমি জানতে চাইলাম কী করে সেটা হল।

'আটত্রিশ বছর বয়েসে, সব কিছু একদিন বদলে গেল। বিছানা থেকে  হঠাৎ জেগে উঠে এমনটা হল, তা নয়। আমি সব সময় জানতাম আমি এক শক্তিময়ী মহিলা, কিন্তু আমি চাইতাম 'চটজলদি খাবারের
মত আনন্দ'। সহজ খুশি। আরো কলাকৌশল। এবং প্রায়ই আমি সেই পুরোনো গাড্ডায় পড়ে যেতাম 'আমি যথেষ্ট সুন্দর নই। যথেষ্ট ছিপছিপে নই। যথেষ্ট ভালো নই।' এক দিন আমার থেরাপিস্ট আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এক প্রধাণ প্রশ্নঃ 'ধরো কিছুই কোনোদিন পাল্টাবে না। তোমার চেহারা, তোমার ওজন, তোমার সফলতার ইতিহাস, এরপর কি তুমি ভালো থাকবে?' সেই প্রথমবার আমি এভাবে ভাবলাম, 'তাই তো! আমি থাকব ভালো। সত্যিই তো ভাল থাকব আমি।'

'তখন বুঝতে পারলাম আমার অতীত আমাকে নির্ধারণ করবে না।

'একই সঙ্গে আমি এমন এক মানুষের সঙ্গে বিয়ে হল, যে আমাকে সত্যি দেখতে পেত। আমার নিজেকে নিয়ে এতখানি খাটাখাটনির উপহার ছিল সে। তাঁর ভিতরে আমি সহৃদয়তা খুঁজে পেলাম। এবং সেই সহৃদয়তাই আমাকে সত্য কথনে সহজ সাবলীল করে তুলল।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ' আমরা যখন নিজের সঙ্গে সাবলীল স্বচ্ছন্দ আপন হই, অনেক সমালোচনাও তখন কিন্তু সহ্য করতে হয়। এই ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা বলুন?' ভিয়োলা বলেন, ' অভিনয়ের জগত খুব নিষ্ঠুর। মন্তব্য যা আসে তা অনেক সময় এরকম, 'যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়। বড্ড বুড়ো। বড্ড কালো। যথেষ্ট রোগা নয়।' সকলে উপদেশ দেন, এখানে এমন মোটা চামড়া গজিয়ে তুলতে যেন কিছুতে কিছু এসে না যায়। কিন্তু গণ্ডার-চামড়া অনেক মূল্যবান সংবেদনকেও দূরে রাখে - যেমন ভালোবাসা, ঘনিষ্টতা, সত্য হবার সাহস।

'আমার ওই মোটা চামড়ার দরকার নেই। গণ্ডার-চামড়া আর কাজ করছে না আমাদের জন্য। আমরা স্বচ্ছতা চাই, আমাদের রঙ আমাদের আত্মা আমাদের আবেগ ধরা পড়ুক সেই স্বচ্ছতায়। তবে আমি অন্য লোকের অক্ষমতা আর সমালোচনাকে আমার আপন করে তুলব না। অন্যরা যা বলে তা আমার বোঝা হতে দেব না।

'আমার বাবা যখন মারা যান আমি তাঁর হাত ধরে ছিলাম। তাঁর প্যাঙ্ক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছিল। আমাদের সম্পর্কে আমরা নিরাময় করে নিয়েছিলাম। আমরা পরস্পরকে ভালবাসাতাম। আমি আর আমার বোন যখন তাঁর সঙ্গে বসেছি, জানতে পারলাম তিনি সারা জীবন তাঁর কাজকে ঘৃণা করে এসেছেন। কয়েক দশক ধরে তিনি রেসের ঘোড়াদের জুততেন, দেখাশোনা করতেন। জানতাম না এ কাজকে তিনি ঘৃণা করেন। তিনি দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন।  তাঁকে অনেক সময় মেথরের কাজ করতে হত।  আমরা জানতাম না তাঁর এমন খারাপ লাগত। তিনি তাঁর সারা জীবন যে কষ্ট পেয়েছেন ভাবতে গিয়ে আমরা ধ্বস্ত হয়ে গেছি।

'এমন এক অলিখিত বার্তা আছে, যে ইতিহাসের পাতায় সেই সব গল্পই লেখা হবে যে গল্পের দাম আছে। এটা সত্যি হতে পারে না। সব গল্পেরই দাম আছে। আমার বাবার গল্পের দাম আছে। আমদের সবার সেই গহন মূল্য আছে, যা আমাদের গল্পকে শোনার যোগ্য করে তোলে। আমরা যেন সকলে দৃশ্যমান হই, গভীর শ্রদ্ধা পেতে পারি, এইসব পাওয়ার চাহিদা নিঃশ্বাস নেওয়ার মতোই মৌলিক।'

ভিয়োলা ডেভিস এখন সেই অরণ্য। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, নিজের কাছে আপন হয়ে বাঁচার জন্য কোনো প্রাত্যহিক অনুশীলন আছে কিনা তাঁর। তিনি জানান, 'হ্যাঁ। আজ আমি অল্প কিছু নিয়ম মেনে চলিঃ

১। আমি আমার যথাসাধ্য ভালোটা দেবার চেষ্টা করছি
২। আমি অন্যদের কাছে নিজেকে তুলে ধরব, তাদের দেখতে দেব আমাকে
৩।  'আরও দূরে যাও। ভয় পেও না। যা আছে সব ঢেলে দাও। কিছু বাকি রেখো না।' --  আমার অভিনয়ের শিক্ষকের এই উপদেশ আমি জীবনে খাটাই।
৪। আমি আমার মেয়ের কাছে রহস্যে আবৃত থাকব না। সে আমাকে জানবে। আমার গল্প শুনবে। আমার ব্যর্থতা, লজ্জা, আমার সফলতার সব গল্প। তখন সে বুঝবে এই গহীন অরণ্যে সে একা নেই।

"এ তো আমি।

"এই আমার উত্তরাধিকার।

"এই আমার ভুল্ভ্রান্তি।

"এসবকে মেনে নেওয়ার অর্থ,  নিজের কাছে আপন হওয়া।"

লেবেলসমূহ: , ,

বার্থ রাইট ভালোবাসা

পুরুষ লেখক আর শিল্পীদের কবিতায় লেখায় গানে ছবিতে যে ভালোবাসার কথা পাল ফুলিয়ে রেখেছে, সে সব কিছুতেই বোঝা গেল না। আর মহিলা লেখক শিল্পীরা ভালোবাসার লৌকিক ধানচালের ছবিটা বেশি বেশি দেখলেন বলে সত্যি কথাটা সাহস করে আর বলতে পারলেন না।

রবি ঠাকুর বললেন বটে, দরজা খোলা রেখে দিয়েছেন। আসা যাওয়া দুই দিকেই। সে কথা আজকের নারীবাদীরা একটু বোধহয় বলছেন। জীবন দিয়ে ততটা প্রমাণ করতে পারছেন কি? মাণিক সাহস করে দিবারাত্রির কাব্যে জানালেন, ভালোবাসার জৈবিক মৃত্যু আছে। ওরকম সাহসী কাউকে দেখা গেল না। 'দুই নারী' উপন্যাসে মোরাভিয়া দেখালেন ভালোবাসার জন্য দুই পয়সা অপেক্ষা না করে বেঁচে থাকা লোক লড়ে বাঁচতে পারে। জীবনকে ভালবাসলে। শিশুসুলভ স্পর্শকাতরতা রক্ষা পায় না।

পরে বিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রজ্ঞা নিয়ে এখানে কেউ আর নতুন কথা বল্ল না দেখা যায়। কান্না, ঢেউ, উচ্ছ্বাস, বাষ্প, অভিশাপ, অভিমান, ভেসে যাওয়া ইত্যাদি বাদ দিলে কী থাকল? বিশ বছর পর এক নস্টালজিয়া? আহা, ভালোবাসা কি শুধু তাই?

কেউ বলল না, ভালোবাসা একটা প্র্যাক্টিস। একটা আর্টের ক্লাস। এসো, শিখি, চলো, শেখাই। সত্যি কি?

ভালোবাসা আমাদের বার্থ রাইট হতে হলে, জল, বাতাস, মাটির মত হয়ত অধিকার হয়ে যাবে দস্যুর দখলে? নিষ্পাপ শিশুশ্রমের মত তাকেও ব্যবহার করা হবে সমাজ সংসারে, কারণ পৃথিবীতে যা ভালো, সুন্দর, সব ক্ষেত্রে তাই হয়? প্রতিষ্ঠার জন্য হয়ত রক্তকমল ফোটাতে হবে, এ কথা তো কেউ বলল না। 'লং সাফারিং' ফাইটের নাম কি ভালোবাসা?

বুড়ো মানুষটা রূপ আর দৈহিক ক্ষমতা হারালে সকলে তাঁকে ত্যাগ করে যায় কেন? তাঁর কি ভালোবাসায় কোনো অধিকার নেই?

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাজা বাদশাদের মহল্লায়

রিক্সাহীন তল্লাট। বরং পাজেরো গাড়ি ভুঁইফোড় গজিয়েছে। দুই কদম ইস্কুলে বা অফিসে যেতে আজকাল গাড়ি লাগে। তাই হয়ত ছাঁটাই হচ্ছে রিক্সা। একদা বাড়িতে এক মাল্টি মিলিনেয়র এসেছিলেন। চকচকে মুখ। কষ্টের অর্জিত টাকা, সে কথা অনেকে বলে। এতো ওপরে উঠেছেন যে নিচে কবে ছিলেন সে কথা মনে করার নস্টালজিয়া আসেনি। অনেক আগে হয়তো রিক্সা চড়তেন। বললেন, রিক্সাওয়ালারা এতো এতো রাস্তা সব দখল করে রেখেছে। হুম, নিজেদের এরা সব রাজা বাদশা ভাবে। আরে গাড়ি যে রাস্তা দিয়ে যায় তোরাও সেই রাস্তা দিয়ে যাবি নাকি?

এই সব যুক্তি নিয়েই হয়ত স্থানীয় রাজা বাদশাদের আদেশে মহল্লায় রিক্সা ছাঁটাই চলছে। আসছে তাদের বদলে নিত্য নতুন গাড়ি। পাবলিকের রাজস্বে নির্মিত হালকা পলকা রাস্তা তাদের নিচে মড়মড় করছে। বাড়িগুলো ধুলোর রেশমে আবৃত হচ্ছে। যেখানে সবুজ ছিল বা থাকার কথা, সেখানে ধূসর ফাটা মাটি হাঁ করে আছে। জমি তো নেই পৃথিবীর রসদে। জীবনের রঙ উথলে আছে হাতে গোনা কিছু বাগানে। মালির তংখা সেখানে দশ হাজার। ফুটপাথহীন রাস্তায় লোহার গ্রিলের নিচে খোলা খোলা ম্যানহোলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে স্নিকারস অথবা চটি পরা কোরিয়ান, আফ্রিকান, বাঙালি, অবাঙালি। শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ। হাঁটু অপারেশন করতে চাওয়া মহিলা। তাদের ফুটপাথ নেই, তাই হাঁটার জায়গা নেই। রোদের রোশনাই না পেয়ে শরীরে ভিটামিন ডি-র অভাব। ডাক্তাররা চশমার আড়াল থেকে জানান, এমন হচ্ছে শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের।

স্কুটারের সংখ্যাও বাড়ছে। কালোর ওপর শাদা ছিট ছিট পলিস্টার শার্ট বাতাসে বেলুনের মতো ওড়াতে ওড়াতে দখল হওয়া খালি জমির ভিতর দিয়ে ইন্দ্রলুপ্ত এক লোক নাকে নীল কাপড় বেঁধে প্যান্টের চেইন টানতে টানতে বেরিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিল। ফুলেফেঁপে ওঠা জামার বেলুনের নিচে তার ভুঁড়ি ঢাকা পড়ে গেল। পুলিশ সেলাম জানালে বোঝা গেল এ লোকটি রাজা বাদশার একজন।

১০.০২.২০১৮

নীল রঙের মধ্যে

অনেক উপরে সিলিং ফ্যান লম্বা ঠ্যাং বেয়ে নেমে এসে নারকেল পাতার লম্বা ডানার মত আর্দ্রতাকে বাষ্পীভূত করছে। সে পাখার কাজ আপাতত প্রায় বিশ জন মানুষের ঘাম শুকানো। পুরোন আমলের দালান। ঠাসা বুনট। কর্মব্যস্ততা। নীল রঙের স্তূপীকৃত কাগজ। রংটা শাদা বা ফ্যাকাশে হলুদ নয় ভাগ্যিস । নীল রঙের মধ্যে আকাশ আছে। আর বেদনার চুপচাপ শরীর দিস্তে দিস্তে। যে এসব দেখছে সে একজন কবি কবি লোক যার নীল রঙের কাগজকে মনে হয় নীল বেদনার পরিবার -- অথচ মজা দেখো -- এরা সকলে পরস্পর শরিক হলেও, কেউ কাউকে চেনে না।

বেদনা আর বেদনার ঘনঘটা নিয়ে একজন স্মার্ট চেক শার্ট, চকলেট রঙের প্যান্ট আর ভারি জুতো প'রে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মেদহীন শরীরে শারীরিক যত্নের ছাপে তাঁর বয়স ঠিক ঠাহর হয় না। কথা বলতে থাকলে খেয়াল হয়, দীর্ঘ দিনের বেদনারা, যারা আদর-যত্ন পায়নি তেমন তার কাছে, তারা তার কপাল আর চোখের নিচে হঠাৎ প্রকট হয়ে ওঠে ভূমিকম্পের ফাটলের মত। তর্জনী তোলার নির্মম রেখা বুঝিয়ে দেয় বেদনারা কেন তুষ্ট হয়ে আশীর্বাদ না করে রুষ্ট হয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেল। বুঝি সে ফাটা শুকনো চৌচির মাটিতে সীতা তলিয়ে যেতে পারেন। যান হয়ত।

সেসবের দিকে খেয়াল না ক'রেও দেখা যায়, কলা, আপেল, আঙু্‌র, বেদানা, নাসপাতি, খেজুর, বাদাম ইত্যাদি নানা দেশের ফলের দোকানীরা ঈষৎ লাভে সততার সঙ্গে বেচাকেনা করছে। মশমশে জুতো, চশমা, ঘামের মধ্যে কলা কিনে সকলকে বিতরণ করতে লেগেছে এতক্ষণে কবি কবি লোকটা। কেউ কেউ সেই কলা ছুঁতে চায় না। দেশী কলায় এসিড হয় না এই মর্মে ফিসফিস করে সে আকাশে তাকালে দেখা যায় নক্সিকাথার মত নরম সুগন্ধী পাতা আছে আকাশ ঢেকে। সূর্যবান্ধব পরিবেশে পাতাদের সিলিং ফ্যান লাগে না। উপঢৌকনের মত পাতারা এখন কথা বলছে একটা একপায়ে লাফিয়ে চলা শাদা-কালো দোয়েলের সঙ্গে। অথবা সেরকম হয়ত ভাবতে চায় লোকটা। মাথায় তার নারকেল তেলের গন্ধ ভুরভুর করে। একটা আখের খেতের মত ঝুরঝুর মিষ্টি গন্ধের স্মৃতি জেগে ওঠে। সকাল বেলার আলোয় শিশুদেরও সেই গন্ধ থাকে গালে আর কপালে।

অম্লজান পাঠানো এই বন্ধুর কথা ভুলিনি, যেন ভাবছে নাচিয়ে দোয়েল, গাছের পাতার সবুজ ঝালরে মাখামাখি ডালের কাঁধে চড়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতে যেতে।

এসব শেষ হলে হুড়োহুড়ি করে ভাত, মাছ, কাঁচকলার ঝোল, বেগুনের তেলতেলে ঝাল আর পাতলা ডাল খেয়ে নিচ্ছে তারা, যারা বেদনার নীল দিস্তের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে ফি-রোজ। একটা মাছ কম পড়লে তারা সেটা ভাগাভাগি করে খেয়ে নেয়। কে কম নেবে, এই নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতা। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও।

১৯ মার্চ ২০১৮

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭

বালতিভরে জল ঢালেন

কেউ কোন কাজ উৎসাহ নিয়ে করলে সেই কাজটা আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু উৎসাহ-কে বিনাশ করার জন্য যারা বদ্ধপরিকর, বা নিদেনপক্ষে বালতিভরে জল ঢালেন (বিশেষ করে পাব্লিক্লি) - তাঁদের কাছে বিনীত নিবেদন, মানব জন্মে গন্ডার হাতি পাখি মেঘ পদ্ম পাঁক বরফ জল ঝর্ণা আগুন সব কিছুর মধ্যে নিহিত আছি ব'লেই আমরা জানি কী করে অবতার থেকে অবতার-অন্তরে যেতে হয়। আপনার অকরুণ নিবেদনে আমাদের লোহার চামড়া পোড়ে আর গজায় বিনিদ্র ঘাস। আপনার শীতল হিম নেতিতে আমাদের শিকড় যে কতো শক্ত তা আমরা ফিরে অনুভব করি।

গরম ভিড়ে দাঁড়িয়ে একা হবার অভিপ্রায় না নিয়েও আমরা জানি আমরা একা। কেউ জীবন দেবে না আমাদের জন্য। আর তা ছাড়া যা বলার আমাদের বলতে হবে। আমাদের জেনেটিক ব্লু প্রিন্ট আর উত্তরাধিকারের চোখ আপনার, বা সঠিক ভাবে বলতে গেলে মানব ভিড়ে আর কারুর নেই -- প্রকৃতির চাওয়ায় এই অপরূপ অসামান্যতা সকলের জন্মগত অধিকার।

আমরা জানি আমাদের মত সামান্য "বামন"দের বাঁচবার আর কাজ প্রকাশ করার অধিকার যাদের প্রিভিলেজ আর মাউথ-পিস আছে, আর আছে স্তাবক-গোপাল, যারা প্রাণের শূন্যতা ভরিয়ে রাখতে চায় ঘী-মাখনে, তাদের সমান।

আপনাদের সংবেদনের শিরাগুলি কিছুদিন হল জমে গেছে। আপনি শিশুদের কাছ থেকে শিখতে পারেন কী করে জলীয় হতে হয়, কী করে বিস্ময় মিশে থাকতে পারে উষ্ণতায়।

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমাদের প্রার্থনা -- যেন কচি আর কাঁচাই থাকতে পারি। খোলা জানালা দিয়ে বিস্ময় আর জীবনের বিচিত্রতা আমাদের হর্ষিত করতে থাকে।

দিনের শেষে আমাদের সব বোঝাপড়াই নিজের সঙ্গে।

আর পুনশ্চ একটা আছে সেটা ইংলিশে দিতে হবে কারণ সেটা একটা উক্তি -
"our fullest potential requires that we notice distraction—and work diligently to overcome it."

সামান্য মানবিক এক ডিস্ট্র্যাকশন-কে সিস্টেম থেকে বের করে দিতে এই লেখা।

২০১৭ ১২ ১৯

সোমবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৭

শেষের কবিতা নিয়ে এই মুনির যা যা মত

শ্রেষ্ঠ বই সেগুলি যেগুলি নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকে। ইয়ে মুনি মানে আমরা যারা মাথা ঘামাতে না পারলে ভাত হজম করতে পারি না আর কি। শেষের কবিতা নিয়ে এই মুনির যা যা মত তা আবার সময়ের সঙ্গে পালটে গেছে বারবার। পুষ্প কোরকের মত এক একটা পাপড়ি উন্মীল হয়েছে বোধের - এক একটা নতুন 'লাবণ্য' 'অমিত' আর 'রবি ঠাকুর' বা 'কেতকী'।

ভেবে দেখতে বাধ্য হলাম যে শেষের কবিতা উনি লিখেছেন নতুন যৌবনে নয়, মাঝবয়েসে নয়, পরিণত অপরাহ্ণে। লাবণ্যের পরিণত 'বাঁধন খোলা' সম্পর্ককে বুঝতে হলে বৌদ্ধ দর্শনের নির্মোহ করুণাময় মৈত্রীর ভাবনায় না এসে উপায় নেই। পড়ুয়া হিসেবে সাহিত্য বুঝলেই হল না, ভাবুক হিসেবে কিছুটা জলের তলায় চুপচাপ কাটাতেও হয়।

যতই হাততালি পড়ুক কল্লোল যুগের বুদ্ধেদেব বসু আর তাঁদের মত লেখকদের কাছে (এখন অবশ্যি রবি ঠাকুর বেশ "অবসোলিট" হয়ে পড়েছেন পড়ুয়া বাঙালিদের তরুণ প্রজন্ম আর মাঝবয়েসীদের কাছে) - বলতেই হবে আম-বাঙালিয়ানা তে প্রেম-বিরহ-রিরংসা-প্রগল্ভতা-হিংস্রতা-আপোস ইত্যাদি বুঝতে যত সহজ মনে হয়, করুণা প্রীতি মুক্তি আর নির্মোহ ঐকান্তিক প্লেটোনিক ভালোবাসা হজম করতে ততটাই শক্ত লাগে। সোনার পাথর বাটির মত।
রঞ্জন-ভাই তাই নানা আছিলায় স্পাইস আনেন তাঁর লেখায়। নাহলে কাটতি হবে না।

সে সময় শেষের কবিতার যা যা পয়েন্ট পাঠককে ঘা দিয়েছিল তা কি এই এক্সপেকটেশন থেকে মুক্ত এক এক্সেপ্টেন্স এর মত বৌদ্ধ ভাবনাকে এড়িয়ে গিয়ে হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছিল। বাঙালি মনে প্রাণে ভোগবাদী। যা ভোগের ব্যাপার নয় তা আবার নিজের হয় কী করে?

যা বুঝি না প্র্যাক্টিস করি না তা চাক্ষুষ করতে কষ্ট হয় বৈকি।
আমি সত্যি বুঝি না বাউল সাধক আর লালন শাহ এদেশে জন্মে এত খ্যাতি পেলেন কী করে!

প্রেমের মধ্যে আকাশ আর সীমা, তৃষ্ণা আর উন্মীলন সব আধার আর ফর্ম-কে দেখার পর লাবণ্য বেছে নিল আকাশ, উন্মীলন। সেখানে সে অনন্ত হয়ে থেকে গেল। এই রহস্যটা কি আমাদের মত নন-স্পিইচুয়াল মুনির তপস্যায় ধরা দেবে রে ভাই!


২০১৭ ১২ ০৭

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৭

শরণার্থী

সকালে উঠে মনে পড়ল কাল রাতেও আমি নিজের শরণার্থী জীবনকে স্বপ্নের আঙ্গিকে দেখে নিয়েছি। পাসপোর্ট হারানো, মাটি হারানো উদ্বাস্তু।

৬ বছরে আফ্রিকায় গিয়েছিলাম। ১০ বছরে অফিশিয়ালি শরণার্থী হিসেবে কেনিয়াতে। উগান্ডায় সামরিক অভ্যুত্থান হচ্ছিল। ভাই পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় মায়ের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিল। তার পর একের পর এক দেশে প্রত্যাবর্তন আর দেশ থেকে বিতাড়িত হবার পালা। এক বার নয়।

'সরস্বতী তোমার গলায় বা কলমে আসবেন,' এই ভরসা দিলে হেসে বলতে ইচ্ছে করে, ঠাকুরদার এক শ বছরের সংগীতের রেওয়াজ, তাঁদের সেতার, এস্রাজ, পাখোয়াজ, তবলা, তানপুরা, বাঁশি, তবলা, হারমোনিয়াম, বীণা ---যখন একের পর এক পাকিস্তানী দোসর আর সাম্প্রদায়িক গুণ্ডা-দের হাতে ভেঙ্গেচুরে সামনে লুটিয়ে পড়ছিল, আরও ছয় বছর বেঁচে থেকেও তিনি সরস্বতী-কে দোষী করেননি, --- আর আমার বাবা-পিসিরা সেই দেখে আরও তেজ নিয়ে প্রজ্বলিত হলেন। আমি কোন ছার।

স্বয়ং মাতা নাকি সরস্বতীর আশীর্বাদের মত বাবার (আমাদের) জীবনে অবতীর্ণ হয়ে হাড় ভেঙে গান আর লেখাপড়াকে উপরে বসালেন। মার বাবা দাদু ছিলেন সমাজকর্মী বিবাগী সংসারী। এমন ইস্কুল নেই তাঁর শহরে যেখানে তিনি নিজের জীবনের শেষ কড়ি দান করেননি। তেমনি মামারাও। একদা এক শিল্পী এসে চোখে জল নিয়ে আমাকে জানাল, তোমাকে দেখতে এলাম। যশোরে তোমার মামাদের দেখেছি। নিজের ভাগ্নি পরিচয়ে মাথায় তুলে তারা আমাকে তাদের সাংস্কৃতিক মঞ্চে গান করতে ডেকেছে। মেয়েটি মুসলিম পরিবারের, সেকথা না বললেও আমার বিস্ময় হত না।

দাদু আর মামা সত্যব্রত উদ্বাস্তু হবেন না পণ করে পাকিস্তানী ঘাতক আর দেশে তাদের দোসরদের হাতে নিহত হলেন। যাদের উত্তরসূরিদের জন্য ইস্কুল গড়ে দিয়েছিলেন, সেরকম কারুর হাতে।

শরণার্থী হবার আঙ্গিকে আমাদের মত হিন্দুয়ানী কথা শুনে যাদের খারাপ লাগছে, তাঁরা জানবেন, সেই সব উদ্বাস্তু হবার দুঃস্বপ্ন যখন বাস্তবকে ছাড়ে না, কারণ তারা বাস্তবের চেয়েও বাস্তব, তখন সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি না, ধরণী দ্বিধা হও।

কিছু করার না পেয়ে লিখি, গান করি, কবিতা লিখি, আর অনুবাদ করি। শিশুর সঙ্গে বই পড়ি।

এমনই অথর্ব আমাদের প্রতিরোধ -- সেই বাস্তুহারা সরস্বতীকেই ডাকি যোদ্ধা হিসেবে।